Saturday, April 30, 2016

বিদায়রীতি - হায় গো রানী, বিদায়বাণী এমনি করে শোনে ?

বিদায়রীতি
- ক্ষণিকা
-
হায় গো রানী, বিদায়বাণী
এমনি করে শোনে?
ছি ছি, ওই-যে হাসিখানি
কাঁপছে আঁখিকোণে!
এতই বারে বারে কি রে
মিথ্যা বিদায় নিয়েছি রে,
ভাবছ তুমি মনে মনে
এ লোকটি নয় যাবার--
দ্বারের কাছে ঘুরে ঘুরে
ফিরে আসবে আবার।
আমায় যদি শুধাও তবে
সত্য করেই বলি--
আমারো সেই সন্দেহ হয়
ফিরে আসব চলি।
বসন্তদিন আবার আসে,
পূর্ণিমা-রাত আবার হাসে,
বকুল ফোটে রিক্ত শাখায়--
এরাও তো নয় যাবার।
সহস্র বার বিদায় নিয়ে
এরাও ফেরে আবার।
একটুখানি মোহ তবু
মনের মধ্যে রাখো,
মিথ্যেটারে একেবারেই
জবাব দিয়ো নাকো।
ভ্রমক্রমে ক্ষণেক-তরে
এনো গো জল আঁখির 'পরে
আকুল স্বরে যখন কব
"সময় হল যাবার'।
তখন নাহয় হেসো, যখন
ফিরে আসব আবার।

বাণিজ্যে বসতে লক্ষ্ণীঃ - কোন্ বাণিজ্যে নিবাস তোমার কহো আমায় ধনী,

বাণিজ্যে বসতে লক্ষ্ণীঃ
- ক্ষণিকা
-
কোন্ বাণিজ্যে নিবাস তোমার
কহো আমায় ধনী,
তাহা হলে সেই বাণিজ্যের
করব মহাজনি।
দুয়ার জুড়ে কাঙাল বেশে
ছায়ার মতো চরণদেশে
কঠিন তব নূপুর ঘেঁষে
আর বসে না রইব--
এটা আমি স্থির বুঝেছি
ভিক্ষা নৈব নৈব।
যাবই আমি যাবই, ওগো,
বাণিজ্যেতে যাবই।
তোমায় যদি না পাই, তবু
আর কারে তো পাবই।
সাজিয়ে নিয়ে জাহাজখানি
বসিয়ে হাজার দাঁড়ি
কোন্ নগরে যাব, দিয়ে
কোন্ সাগরে পাড়ি।
কোন্ তারকা লক্ষ্য করি,
কূল-কিনারা পরিহরি,
কোন্ দিকে যে বাইব তরী
অকূল কালো নীরে--
মরব না আর ব্যর্থ আশায়
বালুমরুর তীরে।
যাবই আমি যাবই, ওগো,
বাণিজ্যেতে যাবই।
তোমার যদি না পাই, তবু
আর কারে তো পাবই।
সাগর উঠে তরঙ্গিয়া,
বাতাস বহে বেগে,
সূর্য যেথায় অস্তে নামে
ঝিলিক মারে মেঘে ।
দক্ষিণে চাই, উত্তরে চাই--
ফেনায় ফেনা, আর কিছু নাই--
যদি কোথাও কূল নাহি পাই
তল পাব তো তবু ।
ভিটার কোণে হতাশমনে
রইব না আর কভু ।
যাবই আমি যাবই, ওগো,
বাণিজ্যেতে যাবই।
তোমায় যদি না পাই, তবু
আর কারে তো পাবই।
নীলের কোলে শ্যামল সে দ্বীপ
প্রবাল দিয়ে ঘেরা,
শৈলচূড়ায় নীড় বেঁধেছে
সাগর-বিহঙ্গরা।
নারিকেলের শাখে শাখে
ঝোড়ো বাতাস কেবল ডাকে,
ঘন বনের ফাঁকে ফাঁকে
বইছে নগনদী--
সোনার রেণু আনব ভরি
সেথায় নামি যদি।
যাবই আমি যাবই, ওগো,
বাণিজ্যেতে যাবই।
তোমায় যদি না পাই, তবু
আর কারে তো পাবই।
অকূল-মাঝে ভাসিয়ে তরী
যাচ্ছি অজানায়
আমি শুধু একলা নেয়ে
আমার শূন্য নায়।
নব নব পবনভরে
যাব দ্বীপে দ্বীপান্তরে,
নেব তরী পূর্ণ করে
অপূর্ব ধন যত।
ভিখারি তোর ফিরবে যখন
ফিরবে রাজার মতো।
যাবই আমি যাবই, ওগো,
বাণিজ্যেতে যাবই।
তোমায় যদি না পাই, তবু
আর কারে তো পাবই।

কবি - আমি যে বেশ সুখে আছি অন্তত নই দুঃখে কৃশ,

কবি
- ক্ষণিকা
-
আমি যে বেশ সুখে আছি
অন্তত নই দুঃখে কৃশ,
সে কথাটা পদ্যে লিখতে
লাগে একটু বিসদৃশ।
সেই কারণে গভীর ভাবে
খুঁজে খুঁজে গভীর চিতে
বেরিয়ে পড়ে গভীর ব্যথা
স্মৃতি কিম্বা বিস্মৃতিতে।
কিন্তু সেটা এত সুদূর
এতই সেটা অধিক গভীর
আছে কি না আছে তাহার
প্রমাণ দিতে হয় না কবির।
মুখের হাসি থাকে মুখে,
দেহের পুষ্টি পোষে দেহ,
প্রাণের ব্যথা কোথায় থাকে
জানে না সেই খবর কেহ।
কাব্য প'ড়ে যেমন ভাব
কবি তেমন নয় গো।
আঁধার ক'রে রাখে নি মুখ,
দিবারাত্র ভাঙছে না বুক,
গভীর দুঃখ ইত্যাদি সব
হাস্যমুখেই বয় গো।
ভালোবাসে ভদ্রসভায়
ভদ্র পোশাক পরতে অঙ্গে,
ভালোবাসে ফুল্ল মুখে
কইতে কথা লোকের সঙ্গে।
বন্ধু যখন ঠাট্টা করে
মরে না সে অর্থ খুঁজে,
ঠিক যে কোথায় হাসতে হবে
একেক সময় দিব্যি বুঝে।
সামনে যখন অন্ন থাকে
থাকে না সে অন্যমনে,
সন্গীদলের সাড়া পেলে
রয় না বসে ঘরের কোণে।
বন্ধুরা কয় "লোকটা রসিক',
কয় কি তারা মিথ্যামিথ্যি?
শত্রুরা কয় "লোকটা হাল্কা',
কিছু কি তার নাইকো ভিত্তি?
কাব্য দেখে যেমন ভাব
কবি তেমন নয় গো।
চাঁদের পানে চক্ষু তুলে
রয় না পড়ে নদীর কূলে,
গভীর দুঃখ ইত্যাদি সব
মনের সুখেই বয় গো।
সুখে আছি লিখতে গেলে
লোকে বলে,"প্রাণটা ক্ষুদ্র!
আশাটা এর নয়কো বিরাট,
পিপাসা এর নয়কো রুদ্র।'
পাঠকদলে তুচ্ছ করে,
অনেক কথা বলে কঠোর--
বলে,"একটু হেসে-খেলেই
ভরে যায় এর মনের জঠর।'
কবিরে তাই ছন্দে বন্ধে
বানাতে হয় দুখের দলিল।
মিথ্যা যদি হয় সে তবু
ফেলো পাঠক চোখের সলিল।
তাহার পরে আশিস কোরো
রুদ্ধকণ্ঠে ক্ষুব্ধবুকে,
কবি যেন আজন্মকাল
দুখের কাব্য লেখেন সুখে।
কাব্য যেমন কবি যেন
তেমন নাহি হয় গো।
বুদ্ধি যেন একটু থাকে,
স্নানাহারের নিয়ম রাখে,
সহজ লোকের মতোই যেন
সরল গদ্য কয় গো।
-
৬ আষাঢ়

কর্মফল - পরজন্ম সত্য হলে কী ঘটে মোর সেটা জানি--

কর্মফল
- ক্ষণিকা
-
পরজন্ম সত্য হলে
কী ঘটে মোর সেটা জানি--
আবার আমায় টানবে ঘরে
বাংলাদেশের এ রাজধানী।
গদ্য পদ্য লিখনু ফেঁদে,
তারাই আমায় আনবে বেঁধে,
অনেক লেখায় অনেক পাতক,
সে মহাপাপ করবে মোচন--
আমায় হয়তো করতে হবে
আমার লেখা সমালোচন।
ততদিনে দৈবে যদি
পক্ষপাতী পাঠক থাকে
কর্ণ হবে রক্তবর্ণ
এমনি কটু বলব তাকে।
যে বইখানি পড়বে হাতে
দগ্ধ করব পাতে পাতে,
আমার ভাগ্যে হব আমি
দ্বিতীয় এক ধূম্রলোচন--
আমায় হয়তো করতে হবে
আমার লেখা সমালোচন।
বলব,"এ-সব কী পুরাতন!
আগাগোড়া ঠেকছে চুরি।
মনে হচ্ছে, আমিও এমন
লিখতে পারি ঝুড়ি ঝুড়ি।'
আরো যে-সব লিখব কথা
ভাবতে মনে বাজছে ব্যথা,
পরজন্মের নিষ্ঠুরতায়
এ জন্মে হয় অনুশোচন--
আমায় হয়তো করতে হবে
আমার লেখা সমালোচন।
তোমরা, যাঁদের বাক্য হয় না
আমার পক্ষে মুখরোচক
তোমরা যদি পুনর্জন্মে
হও পুনর্বার সমালোচক--
আমি আমায় পাড়ব গালি,
তোমরা তখন ভাববে খালি
কলম ক'ষে ব'সে ব'সে
প্রতিবাদের প্রতি বচন।
আমায় হয়তো করতে হবে
আমার লেখা সমালোচন।
লিখব, ইনি কবিসভায়
হংসমধ্যে বকো যথা!
তুমি লিখবে, কোন্ পাষণ্ড
বলে এমন মিথ্যা কথা!
আমি তোমায় বলব--মূঢ়,
তুমি আমায় বলবে--রূঢ়,
তার পরে যা লেখালেখি
হবে না সে রুচিরোচন।
তুমি লিখবে কড়া জবাব,
আমি কড়া সমালোচন।
-
৫  আষাঢ়

জন্মান্তর - আমি ছেড়েই দিতে রাজি আছি সুসভ্যতার আলোক,

জন্মান্তর
- ক্ষণিকা
-
আমি ছেড়েই দিতে রাজি আছি
সুসভ্যতার আলোক,
আমি চাই না হতে নববঙ্গ
নব যুগের চালক।
আমি নাই বা গেলেম বিলাত,
নাই বা    পেলেম রাজার খিলাত,
যদি        পরজন্মে পাই রে হতে
ব্রজের রাখাল বালক
তবে       নিবিয়ে দেব নিজের ঘরে
সুসভ্যতার আলোক।
যারা নিত্য কেবল ধেনু চরায়
বংশীবটের তলে,
যারা গুঞ্জা ফুলের মালা গেঁথে
পরে পরায় গলে,
যারা বৃন্দাবনের বনে
সদাই      শ্যামের বাঁশি শোনে,
যারা যমুনাতে ঝাঁপিয়ে পড়ে
শীতল কালো জলে--
যারা নিত্য কেবল ধেনু চরায়
বংশীবটের তলে।
"ওরে বিহান হল, জাগো রে ভাই'
ডাকে পরস্পরে।
ওরে       ওই-যে দধি-মন্থ-ধ্বনি
উঠল ঘরে ঘরে।
হেরো      মাঠের পথে ধেনু
চলে       উড়িয়ে গো-খুর-রেণু,
হেরো      আঙিনাতে ব্রজের বধূ
দুগ্ধ দোহন করে।
"ওরে বিহান হল, জাগো রে ভাই'
ডাকে পরস্পরে।
ওরে       শাঙন-মেঘের ছায়া পড়ে
কালো তমাল-মূলে,
ওরে       এপার ওপার আঁধার হল
কালিন্দীরই কূলে।
ঘাটে গোপাঙ্গনা ডরে
কাঁপে      খেয়া তরীর 'পরে,
হেরো      কুঞ্জবনে নাচে ময়ূর
কলাপখানি তুলে।
ওরে       শাঙন-মেঘের ছায়া পড়ে
কালো তমাল-মূলে।
মোরা      নবনবীন ফাগুন-রাতে
নীল নদীর তীরে
কোথা যাব চলি অশোকবনে
শিখিপুচ্ছ শিরে।
যবে        দোলার ফুলরশি
দিবে নীপশাখায় কষি
যবে        দখিন-বায়ে বাঁশির ধ্বনি
উঠবে আকাশ ঘিরে
মোরা      রাখাল মিলে করব মেলা
নীল নদীর তীরে।
আমি হব না ভাই নববঙ্গ
নবযুগের চালক,
আমি জ্বালাব না আঁধার দেশে
সুসভ্যতার আলোক।
যদি        ননি-ছানার গাঁয়ে
কোথাও অশোক-নীপের ছায়ে
আমি কোনো জন্মে পারি হতে
ব্রজের গোপবালক
তবে       চাই না হতে নববঙ্গ
নবযুগের চালক।

পথে - গাঁয়ের পথে চলেছিলেম অকারণে, বাতাস বহে বিকালবেলা বেণুবনে।

পথে
- ক্ষণিকা
-
গাঁয়ের পথে চলেছিলেম
অকারণে,
বাতাস বহে বিকালবেলা
বেণুবনে।
ছায়া তখন আলোর ফাঁকে
লতার মতন জড়িয়ে থাকে,
একা একা কোকিল ডাকে
নিজমনে।
আমি কোথায় চলেছিলেম
অকারণে।
জলের ধারে কুটিরখানি
পাতা-ঢাকা,
দ্বারের 'পরে নুয়ে পড়ে
নিম্বশাখা।
ওই যে শুনি মাঝে মাঝে
না জানি কোন্ নিত্যকাজে
কোথায় দুটি কাঁকন বাজে
গৃহকোণে।
যেতে যেতে এলেম হেথা
অকারণে।
দিঘির জলে ঝলক ঝলে
মানিক হীরা,
সর্ষেখেতে উঠছে মেতে
মৌমাছিরা।
এ পথ গেছে কত গাঁয়ে
কত গাছের ছায়ে ছায়ে
কত মাঠের গায়ে গায়ে
কত বনে।
আমি শুধু হেথায় এলেম
অকারণে।
আরেক দিন সে ফাগুন মাসে
বহু আগে
চলেছিলেম এই পথে সেই
মনে জাগে।
আমের বোলের গন্ধে অবশ
বাতাস ছিল উদাস অলস,
ঘাটের শানে বাজছে কলস
ক্ষণে ক্ষণে।
সে-সব কথা ভাবছি বসে
অকারণে।
দীর্ঘ হয়ে পড়ছে পথে
বাঁকা ছায়া,
গোষ্ঠঘরে ফিরছে ধেনু
শ্রান্তকায়া।
গোধূলিতে খেতের 'পরে
ধূসর আলো ধূ ধূ করে,
বসে আছে খেয়ার তরে
পান্থজনে।
আবার ধীরে চলছি ফিরে
অকারণে।

প্রতিজ্ঞা - আমি হব না তাপস, হব না, হব না, যেমনি বলুন যিনি।

প্রতিজ্ঞা
- ক্ষণিকা
-
আমি হব না তাপস, হব না, হব না,
যেমনি বলুন যিনি।
আমি       হব না তাপস নিশ্চয় যদি
না মেলে তপস্বিনী।
আমি       করেছি কঠিন পণ
যদি        না মিলে বকুলবন,
যদি        মনের মতন মন
না পাই জিনি,
তবে       হব না তাপস, হব না, যদি না
পাই সে তপস্বিনী।
আমি       ত্যজিব না ঘর, হব না বাহির
উদাসীন সন্ন্যাসী,
যদি        ঘরের বাহিরে না হাসে কেহই
ভুবন-ভুলানো হাসি।
যদি        না উড়ে নীলাঞ্চল
মধুর       বাতাসে বিচঞ্চল,
যদি        না বাজে কাঁকন মল
রিনিক-ঝিনি--
আমি       হব না তাপস, হব না, যদি না
পাই গো তপস্বিনী।
আমি       হব না তাপস, তোমার শপথ,
যদি সে তপের বলে
কোনো     নূতন ভুবন না পারি গড়িতে
নূতন হৃদয়-তলে।
যদি        জাগায়ে বীণার তার
কারো      টুটিয়া মরম-দ্বার,
কোনো     নূতন আঁখির ঠার
না লই চিনি
আমি       হব না তাপস, হব না, হব না,
না পেলে তপস্বিনী।