Sunday, May 15, 2016

নষ্ট স্বপ্ন - কালকে রাতে মেঘের গরজনে রিমিঝিমি-বাদল-বরিষনে

নষ্ট স্বপ্ন
- ক্ষণিকা
-
কালকে রাতে মেঘের গরজনে
রিমিঝিমি-বাদল-বরিষনে
            ভাবিতেছিলাম একা একা--
স্বপ্ন যদি যায় রে দেখা
আসে যেন তাহার মূর্তি ধ'রে
বাদলা রাতে আধেক ঘুমঘোরে।
মাঠে মাঠে বাতাস ফিরে মাতি,
বৃথা স্বপ্নে কাটল সারা রাতি।
হায় রে, সত্য কঠিন ভারী,
ইচ্ছামত গড়তে নারি--
স্বপ্ন সেও চলে আপন মতে,
আমি চলি আমার শূন্য পথে।
কালকে ছিল এমন ঘন রাত,
আকুল ধারে এমন বারিপাত,
মিথ্যা যদি মধুর রূপে
আসত কাছে চুপে চুপে
তাহা হলে কাহার হত ক্ষতি
স্বপ্ন যদি ধরত সে মূরতি?

Saturday, May 14, 2016

একটি মাত্র - গিরিনদী বালির মধ্যে যাচ্ছে বেঁকে বেঁকে,

একটি মাত্র
- ক্ষণিকা
-
গিরিনদী বালির মধ্যে
যাচ্ছে বেঁকে বেঁকে,
একটি ধারে স্বচ্ছ ধারায়
শীর্ণ রেখা এঁকে।
মরু-পাহাড়-দেশে
শুষ্ক বনের শেষে
ফিরেছিলেম দুই প্রহরে
দগ্ধ চরণতল।
বনের মধ্যে পেয়েছিলেম
একটি আঙুর ফল।
রৌদ্র তখন মাথার 'পরে
পায়ের তলায় মাটি
জলের তরে কেঁদে মরে
তৃষায় ফাটি ফাটি।
পাছে ক্ষুধার ভরে
তুলি মুখের 'পরে
আকুল ঘ্রাণে নিই নি তাহার
শীতল পরিমল।
রেখেছিলেম লুকিয়ে আমার
একটি আঙুর ফল।
বেলা যখন পড়ে এল,
রৌদ্র হল রাঙা,
নিশ্বাসিয়া উঠল হু হু
ধূ ধূ বালুর ডাঙা--
থাকতে দিনের আলো
ঘরে ফেরাই ভালো,
তখন খুলে দেখনু চেয়ে
চক্ষে লয়ে জল
মুঠির মাঝে শুকিয়ে আছে
একটি আঙুর ফল।

সোজাসুজি - হৃদয়-পানে হৃদয় টানে, নয়ন-পানে নয়ন ছোটে,

সোজাসুজি
- ক্ষণিকা
-
হৃদয়-পানে হৃদয় টানে,
নয়ন-পানে নয়ন ছোটে,
দুটি প্রাণীর কাহিনীটা
এইটুকু বৈ নয়কো মোটে।
শুক্লসন্ধ্যা চৈত্র মাসে
হেনার গন্ধ হাওয়ায় ভাসে--
আমার বাঁশি লুটায় ভূমে,
তোমার কোলে ফুলের পুঁজি।
তোমার আমার এই-যে প্রণয়
নিতান্তই এ
সোজাসুজি।
বাসন্তী-রঙ বসনখানি
        নেশার মতো চক্ষে ধরে,
তোমার গাঁথা যূথীর মালা
স্তুতির মতো বক্ষে পড়ে।
একটু দেওয়া একটু রাখা,
একটু প্রকাশ একটু ঢাকা,
একটু হাসি একটু শরম--
দুজনের এই বোঝাবুঝি।
তোমার আমার এই-যে প্রণয়
নিতান্তই এ সোজাসুজি।
মধুমাসের মিলন-মাঝে
মহান কোনো রহস্য নেই,
অসীম কোনো অবোধ কথা
যায় না বেধে মনে-মনেই।
আমাদের এই সুখের পিছু
ছায়ার মতো নাইকো কিছু,
দোঁহার মুখে দোঁহে চেয়ে
নাই হৃদয়ের খোঁজাখুঁজি।
মধুমাসে মোদের মিলন
নিতান্তই এ সোজাসুজি।
ভাষার মধ্যে তলিয়ে গিয়ে
খুঁজি নে ভাই ভাষাতীত,
আকাশ-পানে বাহু তুলে
চাহি নে ভাই আশাতীত।
যেটুকু দিই যেটুকু পাই
তাহার বেশি আর কিছু নাই--
সুখের বক্ষ চেপে ধরে
করি নে কেউ যোঝাযুঝি।
মধুমাসে মোদের মিলন
নিতান্তই এ
সোজাসুজি।
শুনেছিনু প্রেমের পাথার
নাইকো তাহার কোনো দিশা,
শুনেছিনু প্রেমের মধ্যে
অসীম ক্ষুধা অসীম তৃষা--
বীণার তন্ত্রী কঠিন টানে
ছিঁড়ে পড়ে প্রেমের তানে,
শুনেছিনু প্রেমের কুঞ্জে
অনেক বাঁকা গলিঘুঁজি।
আমাদের এই দোঁহার মিলন
নিতান্তই এ সোজাসুজি।

অসাবধান - আমায় যদি মনটি দেবে দিয়ো, দিয়ো মন--

অসাবধান
- ক্ষণিকা
-
আমায় যদি মনটি দেবে
দিয়ো, দিয়ো মন--
মনের মধ্যে ভাবনা কিন্তু
রেখো সারাক্ষণ।
খোলা আমার দুয়ারখানা,
ভোলা আমার প্রাণ--
কখন যে কার আনাগোনা
নইকো সাবধান।
পথের ধারে বাড়ি আমার,
থাকি গানের ঝোঁকে--
বিদেশী সব পথিক এসে
যেথা-সেথাই ঢোকে।
ভাঙে কতক, হারায় কতক
যা আছে মোর দামি--
এমনি ক'রে একে একে
সর্বস্বান্ত আমি।
আমায় যদি মনটি দেবে দিয়ো, দিয়ো
মন--
মনের মধ্যে ভাবনা কিন্তু রেখো
সারাক্ষণ।
আমায় যদি মনটি দেবে
নিষেধ তাহে নাই,
কিছুর তরে আমায় কিন্তু
কোরো না কেউ দায়ী।
ভুলে যদি শপথ ক'রে
বলি কিছু কবে,
সেটা পালন না করি তো
মাপ করিতেই হবে।
ফাগুন মাসে পূর্ণিমাতে
যে নিয়মটা চলে
রাগ কোরো না চৈত্র মাসে
সেটা ভন্গ হলে।
কোনো দিন বা পূজার সাজি
কুসুমে হয় ভরা,
কোনো দিন বা শূন্য থাকে--
মিথ্যা সে দোষ ধরা।
আমায় যদি মনটি দেবে নিষেধ তাহে
নাই,
কিছুর তরে আমায় কিন্তু কোরো না কেউ
দায়ী।
আমায় যদি মনটি দেবে
রাখিয়া যাও তবে,
দিয়েছ যে সেটা কিন্তু
ভুলে থাকতে হবে।
দুটি চক্ষে বাজবে তোমার
নবরাগের বাঁশি,
কণ্ঠে তোমার উচ্ছ্বসিয়া
উঠবে হাসিরাশি।
প্রশ্ন যদি শুধাও কভু
মুখটি রাখি বুকে,
মিথ্যা কোনো জবাব পেলে
হেসো সকৌতুকে।
যে দুয়ারটা বন্ধ থাকে
বন্ধ থাকতে দিয়ো,
আপনি যাহা এসে পড়ে
তাহাই হেসে নিয়ো।
আমায় যদি মনটি দেবে, রাখিয়া যাও
তবে--
দিয়েছ যে সেটা কিন্তু ভুলে থাকতে
হবে।

স্বল্পশেষ - অধিক কিছু নেই গো কিছু নেই,

স্বল্পশেষ
- ক্ষণিকা
-
অধিক কিছু নেই গো কিছু নেই,
কিছু নেই--
যা আছে তা এই গো শুধু এই,
শুধু এই।
যা ছিল তা শেষ করেছি
একটি বসন্তেই।
আজ যা কিছু বাকি আছে
সামান্য এই দান--
তাই নিয়ে কি রচি দিব
একটি ছোটো গান?
একটি ছোটো মালা তোমার
হাতের হবে বালা।
একটি ছোটো ফুল তোমার
কানের হবে দুল।
একটি তরুলতায় ব'সে
একটি ছোটো খেলায়
হারিয়ে দিয়ে যাবে মোরে
একটি সন্ধেবেলায়।
অধিক কিছু নেই গো কিছু নেই,
কিছু নেই।
যা আছে তা এই গো শুধু এই,
শুধু এই।
ঘাটে আমি একলা বসে রই,
ওগো আয়!
বর্ষানদী পার হবি কি ওই--
হায় গো হায়!
অকূল-মাঝে ভাসবি কে গো
ভেলার ভরসায়।
আমার তরীখান
সইবে না তুফান;
তবু যদি লীলাভরে
চরণ কর দান,
শান্ত তীরে তীরে তোমায়
বাইব ধীরে ধীরে।
একটি কুমুদ তুলে তোমার
পরিয়ে দেব চুলে।
ভেসে ভেসে শুনবে বসে
কত কোকিল ডাকে
কূলে কূলে কুঞ্জবনে
নীপের শাখে শাখে।
ক্ষুদ্র আমার তরীখানি--
সত্য করি কই,
হায় গো পথিক, হায়,
তোমায় নিয়ে একলা নায়ে
পার হব না ওই
আকুল যমুনায়।

কূলে - আমাদের এই নদীর কূলে নাইকো স্নানের ঘাট,

কূলে
- ক্ষণিকা
-
আমাদের এই নদীর কূলে
নাইকো স্নানের ঘাট,
ধূধূ করে মাঠ।
ভাঙা পাড়ির গায়ে শুধু
শালিখ লাখে লাখে
খোপের মধ্যে থাকে।
সকালবেলা অরুণ আলো
পড়ে জলের 'পরে,
নৌকা চলে দু-একখানি
অলস বায়ু-ভরে।
আঘাটাতে বসে রইলে,
বেলা যাচ্ছে বয়ে--
দাও গো মোরে কয়ে
ভাঙন-ধরা কূলে তোমার
আর কিছু কি চাই?
সে কহিল,ভাই,
না ই, না ই, নাই গো আমার
কিছুতে কাজ নাই।
আমাদের এ নদীর কূলে
ভাঙা পাড়ির তল,
ধেনু খায় না জল।
দূর গ্রামের দু-একটি ছাগ
বেড়ায় চরি চরি
সারা দিবস ধরি।
জলের 'পরে বেঁকে-পড়া
খেজুর-শাখা হতে
ক্ষণে ক্ষণে মাছরাঙাটি
ঝাঁপিয়ে পড়ে স্রোতে।
ঘাসের 'পরে অশথতলে
যাচ্ছে বেলা বয়ে--
দাও আমারে কয়ে
আজকে এমন বিজন প্রাতে
আর কারে কি চাই?
সে কহিল, ভাই,
না ই, না ই, নাই গো আমার
কারেও কাজ নাই।

Wednesday, May 11, 2016

শেষের কবিতা

শেষের কবিতা
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
-
কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কি পাও।
তারি রথ নিত্যই উধাও
জাগাইছে অন্তরীক্ষে হৃদয়স্পন্দন,
চক্রে-
পিষ্ট আঁধারের বক্ষফাটা তারার ক্রন্দন।
                 ওগো বন্ধু,
             সেই ধাবমান কাল
      জড়ায়ে ধরিল মোরে ফেরি তার জাল--
             তুলে নিল দ্রুতরথে
      দুঃসাহসী ভ্রমণের পথে
         তোমা হতে বহু দূরে।
             মনে হয়, অজস্র মৃত্যুরে
         পার হয়ে আসিলাম
      আজি নবপ্রভাতের শিখরচূড়ায়--
         রথের চঞ্চল বেগ হাওয়ায় উড়ায়
             আমার পুরানো নাম।
         ফিরিবার পথ নাহি;
             দূর হতে যদি দেখ চাহি
                 পারিবে না চিনিতে আমায়।
                         হে বন্ধু, বিদায়।
      কোনোদিন কর্মহীন পূর্ণ অবকাশে
             বসন্তবাতাসে
      অতীতের তীর হতে যে রাত্রে বহিবে দীর্ঘশ্বাস,
             ঝরা বকুলের কান্না ব্যথিবে আকাশ,
      সেই ক্ষণে খুঁজে দেখো--
কিছু মোর পিছে রহিল সে
             তোমার প্রাণের প্রান্তে; বিস্মৃতিপ্রদোষে
                 হয়তো দিবে সে জ্যোতি,
      হয়তো ধরিবে কভু নাম-হারা স্বপ্নের মুরতি।
                 তবু সে তো স্বপ্ন নয়,
      সব-চেয়ে সত্য মোর, সেই মৃত্যুঞ্জয়,
                 সে আমার প্রেম।
         তারে আমি রাখিয়া এলেম
      অপরিবর্তন অর্ঘ্য তোমার উদ্দেশে।
         পরিবর্তনের স্রোতে আমি যাই ভেসে
             কালের যাত্রায়।
                 হে বন্ধু, বিদায়।
                  তোমার হয় নি কোনো ক্ষতি
   মর্তের মৃত্তিকা মোর, তাই দিয়ে অমৃতমুরতি
           যদি সৃষ্টি করে থাক, তাহারি আরতি
             হোক তব সন্ধ্যাবেলা,
                 পূজার সে খেলা
      ব্যাঘাত পাবে না মোর প্রত্যহের ম্লান স্পর্শ লেগে;
             তৃষার্ত আবেগ-বেগে
      ভ্রষ্ট নাহি হবে তার কোনো ফুল নৈবেদ্যের থালে।
             তোমার মানস-ভোজে সযত্নে সাজালে
      যে ভাবরসের পাত্র বাণীর তৃষায়,
             তার সাথে দিব না মিশায়ে
      যা মোর ধূলির ধন, যা মোর চক্ষের জলে ভিজে।
             আজো তুমি নিজে
             হয়তো-বা করিবে রচন
      মোর স্মৃতিটুকু দিয়ে স্বপ্নাবিষ্ট তোমার বচন।
      ভার তার না রহিবে, না রহিবে দায়।
             হে বন্ধু, বিদায়।
             মোর লাগি করিয়ো না শোক,
      আমার রয়েছে কর্ম, আমার রয়েছে বিশ্বলোক।
             মোর পাত্র রিক্ত হয় নাই--
      শূন্যেরে করিব পূর্ণ, এই ব্রত বহিব সদাই।
      উৎকণ্ঠ আমার লাগি কেহ যদি প্রতীক্ষিয়া থাকে
             সেই ধন্য করিবে আমাকে।
             শুক্লপক্ষ হতে আনি
             রজনীগন্ধার বৃন্তখানি
                      যে পারে সাজাতে
             অর্ঘ্যথালা  কৃষ্ণপক্ষ রাতে,
             যে আমারে দেখিবারে পায়
                 অসীম ক্ষমায়
             ভালো মন্দ মিলায়ে সকলি,
      এবার পূজায় তারি আপনারে দিতে চাই বলি।
                 তোমারে যা দিয়েছিনু তার
                 পেয়েছ নিঃশেষ অধিকার।
                 হেথা মোর তিলে তিলে দান,
      করুণ মুহূর্তগুলি গণ্ডূষ ভরিয়া করে পান
             হৃদয়-অঞ্জলি হতে মম।
                 ওগো তুমি নিরুপম,
                       হে ঐশ্বর্যবান,
             তোমারে যা দিয়েছিনু সে তোমারি দান--
                 গ্রহণ করেছ যত ঋণী তত করেছ আমায়।
                       হে বন্ধু, বিদায়।