Thursday, September 8, 2016

আমারে তুমি অশেষ করেছ

আমারে তুমি অশেষ করেছ, এমনি লীলা তব–
ফুরায়ে ফেলে আবার ভরেছ জীবন নব নব।।
কত-যে গিরি কত-যে নদী -তীরে
বেড়ালে বহি ছোটো এ বাঁশিটিরে,
কত-যে তান বাজালে ফিরে ফিরে
কাহারে তাহা কব।।
তোমারি ওই অমৃতপরশে     আমার হিয়াখানি
হারালো সীমা বিপুল হরষে, উথলি উঠে বাণী।
আমার শুধু একটি মুঠি ভরি
দিতেছ দান দিবস-বিভাবরী–
হল না সারা, কত-না যুগ ধরি
কেবলই আমি লব।।
-
রাগ: ছায়ানট
তাল: ঝম্পক
রচনাকাল (বঙ্গাব্দ): ৭ বৈশাখ, ১৩১৯
রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ): 1912
রচনাস্থান: শান্তিনিকেতন
স্বরলিপিকার: দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর, ভীমরাও শাস্ত্রী

Tuesday, August 16, 2016

মোর প্রভাতের এই প্রথম খনের কুসুমখানি

মোর প্রভাতের এই প্রথম খনের কুসুমখানি
তুমি          জাগাও তারে ওই নয়নের আলোক হানি ॥
সে যে দিনের বেলায় করবে খেলা হাওয়ায় দুলে,
রাতের অন্ধকারে নেবে তারে বক্ষে তুলে--
ওগো          তখনি তো গন্ধে তাহার ফুটবে বাণী ॥
আমার        বীণাখানি পড়ছে আজি সবার চোখে,
হেরো তারগুলি তার দেখছে গুনে সকল লোকে।
ওগো          কখন সে যে সভা ত্যেজে আড়াল হবে,
শুধু সুরটুকু তার উঠবে বেজে করুণ রবে--
যখন          তুমি তারে বুকের 'পরে লবে টানি ॥
-
রাগ: রামকেলী
তাল: দাদরা
রচনাকাল (বঙ্গাব্দ): 1321
রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ): 1914
রচনাস্থান: শান্তিনিকেতন
স্বরলিপিকার: দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

Wednesday, July 13, 2016

আজি প্রভাতেও শ্রান্ত নয়নে

আজি প্রভাতেও শ্রান্ত নয়নে
রয়েছে কাতর ঘোর।
দুখশয্যায় করি জাগরণ
রজনী হয়েছে ভোর।
নবফুটন্ত ফুলকাননের
নব জাগ্রত শীতপবনের
সাথি হইবারে পারে নি আজিও
এ দেহ-হৃদয় মোর।
আজি মোর কাছে প্রভাত তোমার
করো গো আড়াল করো--
এ খেলা এ মেলা এ আলো এ গীত
আজি হেথা হতে হরো।
প্রভাত জগৎ হতে মোরে ছিঁড়ি
করুণ আঁধারে লহো মোরে ঘিরি,
উদাস হিয়ারে তুলিয়া বাঁধুক
তব স্নেহবাহুডোর।

Saturday, July 9, 2016

কৈশোরিকা - হে কৈশোরের প্রিয়া

কৈশোরিকা
- বীথিকা
-
হে কৈশোরের প্রিয়া,
ভোরবেলাকার আলোক-আঁধার-লাগা
চলেছিলে তুমি আধ্ঘুমো-আধ্জাগা
মোর জীবনের ঘন বনপথ দিয়া।
ছায়ায় ছায়ায় আমি ফিরিতাম একা,
দেখি দেখি করি শুধু হয়েছিল দেখা
চকিত পায়ের চলার ইশারাখানি।
চুলের গন্ধে ফুলের গন্ধে মিলে
পিছে পিছে তব বাতাসে চিহ্ন দিলে
বাসনার রেখা টানি।
প্রভাত উঠিল ফুটি।
অরুণরাঙিমা দিগন্তে গেল ঘুচে,
শিশিরের কণা কুঁড়ি হতে গেল মুছে,
গাহিল কুঞ্জে কপোতকপোতী দুটি।
ছায়াবীথি হতে বাহিরে আসিলে ধীরে
ভরা জোয়ারের উচ্ছল নদীতীরে--
প্রাণকল্লোলে মুখর পল্লিবাটে।
আমি কহিলাম, "তোমাতে আমাতে চলো,
তরুণ রৌদ্র জলে করে ঝলোমলো--
নৌকা রয়েছে ঘাটে।"
স্রোতে চলে তরী ভাসি।
জীবনের-স্মৃতি-সঞ্চয়-করা তরী
দিনরজনীর সুখে দুখে গেছে ভরি,
আছে গানে-গাঁথা কত কান্না ও হাসি।
পেলব প্রাণের প্রথম পসরা নিয়ে
সে তরণী-'পরে পা ফেলেছ তুমি প্রিয়ে,
পাশাপাশি সেথা খেয়েছি ঢেউয়ের দোলা।
কখনো বা কথা কয়েছিলে কানে কানে,
কখনো বা মুখে ছলোছলো দুনয়ানে
চেয়েছিলে ভাষা-ভোলা।
বাতাস লাগিল পালে।
ভাঁটার বেলায় তরী যবে যায় থেমে
অচেনা পুলিনে কবে গিয়েছিলে নেমে
মলিন ছায়ার ধূসর গোধূলিকালে।
আবার রচিলে নব কুহকের পালা,
সাজালে ডালিতে নূতন বরণমালা,
নয়নে আনিলে নূতন চেনার হাসি।
কোন্ সাগরের অধীর জোয়ার লেগে
আবার নদীর নাড়ী নেচে ওঠে বেগে,
আবার চলিনু ভাসি।
তুমি ভেসে চল সাথে।
চিররূপখানি নবরূপে আসে প্রাণে;
নানা পরশের মাধুরীর মাঝখানে
তোমারই সে হাত মিলেছে আমার হাতে।
গোপন গভীর রহস্যে অবিরত
ঋতুতে ঋতুতে সুরের ফসল যত
ফলায়ে তুলেছে বিস্মিত মোর গীতে।
শুকতারা তব কয়েছিল যে কথারে
সন্ধ্যার আলো সোনার গলায় তারে
সকরুণ পূরবীতে।
চিনি, নাহি চিনি তবু।
প্রতি দিবসের সংসারমাঝে তুমি
স্পর্শ করিয়া আছ যে-মর্তভূমি
তার আবরণ খসে পড়ে যদি কভু,
তখন তোমার মূরতি দীপ্তিমতী
প্রকাশ করিবে আপন অমরাবতী
সকল কাজের বিরহের মহাকাশে।
তাহারই বেদনা কত কীর্তির স্তূপে
উচ্ছ্রিত হয়ে ওঠে অসংখ্য রূপে
পুরুষের ইতিহাসে।
হে কৈশোরের প্রিয়া,
এ জনমে তুমি নব জীবনের দ্বারে
কোন্ পার হতে এনে দিলে মোর পায়ে
অনাদি যুগের চিরমানবীর হিয়া।
দেশের কালের অতীত যে মহাদূর,
তোমার কণ্ঠে শুনেছি তাহারই সুর--
বাক্য সেথায় নত হয় পরাভবে।
অসীমের দূতী, ভরে এনেছিলে ডালা
পরাতে আমারে নন্দনফুলমালা
অপূর্ব গৌরবে।
-
৯ মাঘ, ১৩৪০

Thursday, July 7, 2016

তোমায় গান শোনাব - Tomai Gaan Shonabo

তোমায় গান শোনাব তাই তো আমায় জাগিয়ে রাখ
ওগো ঘুম-ভাঙানিয়া
বুকে    চমক দিয়ে তাই তো ডাক'
ওগো    দুখজাগানিয়া ॥
এল    আঁধার ঘিরে,    পাখি    এল নীড়ে,
তরী এল তীরে
শুধু    আমার হিয়া বিরাম পায় নাকো
ওগো    দুখজাগানিয়া ॥
আমার    কাজের মাঝে মাঝে
কান্নাহাসির দোলা তুমি থামতে দিলে না যে।
আমার    পরশ ক'রে    প্রাণ    সুধায় ভ'রে
তুমি    যাও যে সরে--
বুঝি    আমার ব্যথার আড়ালেতে দাঁড়িয়ে থাক
ওগো    দুখজাগানিয়া ॥
-
রাগ: পিলু
তাল: কাহারবা
রচনাকাল (বঙ্গাব্দ): ২৯ ফাল্গুন, ১৩২৯
রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ): ১৩ মার্চ, ১৯২৩
রচনাস্থান: আমেদাবাদ
স্বরলিপিকার: দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

Wednesday, July 6, 2016

তুমি একলা ঘরে বসে বসে কী সুর বাজালে

তুমি একলা ঘরে বসে বসে কী সুর বাজালে
প্রভু, আমার জীবনে!
তোমার পরশরতন গেঁথে গেঁথে আমায় সাজালে
প্রভু, গভীর গোপনে ॥
দিনের আলোর আড়াল টানি কোথায় ছিলে নাহি
জানি,
অস্তরবির তোরণ হতে চরণ বাড়ালে
আমার রাতের স্বপনে ॥
আমার হিয়ায় হিয়ায় বাজে আকুল আঁধার যামিনী,
সে যে তোমার বাঁশরি।
আমি শুনি তোমার আকাশপারের তারার রাগিণী,
আমার সকল পাশরি।
কানে আসে আশার বাণী-- খোলা পাব দুয়ারখানি
রাতের শেষে শিশির-ধোওয়া প্রথম সকালে
তোমার করুণ কিরণে ॥

Sunday, July 3, 2016

শেষের কবিতা - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (পর্ব-৯)

শেষের কবিতা (পর্ব-৯)
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
-
অমিত মিশুক মানুষ। প্রকৃতির সৌন্দর্য নিয়ে তার বেশিক্ষণ
চলে না। সর্বদাই নিজে বকা-ঝকা করা অভ্যাস। গাছপালা-
পাহাড়পর্বতের সঙ্গে হাসিতামাশা চলে না, তাদের সঙ্গে
কোনোরকম উলটো ব্যবহার করতে গেলেই ঘা খেয়ে মরতে
হয়; তারাও চলে নিয়মে, অন্যের ব্যবহারেও তারা নিয়ম
প্রত্যাশা করে; এক কথায়, তারা অরসিক, সেইজন্যে শহরের
বাইরে ওর প্রাণ হাঁপিয়ে ওঠে।

কিন্তু হঠাৎ কী হল, শিলং পাহাড়টা চার দিক থেকে অমিতকে
নিজের মধ্যে যেন রসিয়ে নিচ্ছে। আজ সে উঠেছে সূর্য
ওঠবার আগেই; এটা ওর স্বধর্মবিরুদ্ধ। জানলা দিয়ে দেখলে,
দেবদারু গাছের ঝালরগুলো কাঁপছে, আর তার পিছনে পাতলা
মেঘের উপর পাহাড়ের ওপার থেকে সূর্য তার তুলির লম্বা
লম্বা সোনালি টান লাগিয়েছে--আগুনে-জ্বলা যে-সব রঙের
আভা ফুটে উঠছে তার সম্বন্ধে চুপ করে থাকা ছাড়া আর
কোনো উপায় নেই।

তাড়াতাড়ি এক পেয়ালা চা খেয়ে অমিত বেরিয়ে পড়ল। রাস্তা
তখন নির্জন। একটা শ্যাওলাধরা অতি প্রাচীন পাইন গাছের
তলায় স্তরে স্তরে ঝরা-পাতার সুগন্ধ-ঘন আস্তরণের উপর
পা ছড়িয়ে বসল। সিগারেট জ্বালিয়ে দুই আঙুলে অনেকক্ষণ
চেপে রেখে দিলে, টান দিতে গেল ভুলে।

যোগমায়ার বাড়ির পথে এই বন। ভোজে বসবার পূর্বে
রান্নাঘরটা থেকে যেমন আগাম গন্ধ পাওয়া যায়, এই জায়গা
থেকে যোগমায়ার বাড়ির সৌরভটা অমিত সেইরকম ভোগ
করে। সময়টা ঘড়ির ভদ্র দাগটাতে এসে পৌঁছলেই সেখানে
গিয়ে এক পেয়ালা চা দাবি করবে। প্রথমে সেখানে ওর যাবার
সময় নির্দিষ্ট ছিল সন্ধেবেলায়। অমিত সাহিত্যরসিক, এই
খ্যাতিটার সুযোগে আলাপ-আলোচনার জন্যে ও পেয়েছিল
বাঁধা নিমন্ত্রণ। প্রথম দুই-চারি দিন যোগমায়া এই
আলোচনায় উৎসাহ প্রকাশ করেছিলেন, কিন্তু যোগমায়ার
কাছে ধরা পড়ল যে, তাতে করেই এ পক্ষের উৎসাহটাকে কিছু
যেন কুণ্ঠিত করলে। বোঝা শক্ত নয় যে, তার কারণ
দ্বিবচনের জায়গায় বহুবচন প্রয়োগ। তার পর থেকে
যোগমায়ার অনুপস্থিত থাকবার উপলক্ষ ঘন ঘন ঘটত। একটু
বিশ্লেষণ করতেই বোঝা গেল, সেগুলি অনিবার্য নয়, দৈবকৃত
নয়, তাঁর ইচ্ছাকৃত। প্রমাণ হল, কর্তামা এই দুটি
আলোচনাপরায়ণের যে অনুরাগ লক্ষ্য করেছেন সেটা
সাহিত্যানুরাগের চেয়ে বিশেষ একটু গাঢ়তর। অমিত বুঝে নিলে
যে, মাসির বয়স হয়েছে বটে, কিন্তু দৃষ্টি তীক্ষ্ম, অথচ
মনটি আছে কোমল। এতে করেই আলোচনার উৎসাহ তার
আরো প্রবল হল। নির্দিষ্ট কালটাকে প্রশস্ততর করবার
অভিপ্রায়ে যতিশংকরের সঙ্গে আপসে ব্যবস্থা করলে, তাকে
সকালে এক ঘণ্টা এবং বিকেলে দু ঘণ্টা ইংরেজি সাহিত্য
পড়ায় সাহায্য করবে। শুরু করলে সাহায্য-- এত
বাহুল্যপরিমাণে যে, প্রায়ই সকাল গড়াত দুপুরে, সাহায্য
গড়াত বাজে কথায়, অবশেষে যোগমায়ার এবং ভদ্রতার
অনুরোধে মধ্যাহ্নভোজনটা অবশ্যকর্তব্য হয়ে পড়ত। এমনি
করে দেখা গেল অবশ্যকর্তব্যতার পরিধি প্রহরে প্রহরে
বেড়েই চলে।

যতিশংকরের অধ্যাপনায় ওর যোগ দেবার কথা সকাল
আটটায়। ওর প্রকৃতিস্থ অবস্থায় সেটা ছিল অসময়। ও
বলত, যে জীবের গর্ভবাসের মেয়াদ দশ মাস তার ঘুমের
মেয়াদ পশুপক্ষীদের মাপে সংগত হয় না। এতদিন অমিতর
রাত্রিবেলাটা তার সকলাবেলাকার অনেকগুলো ঘণ্টাকে
পিলপেগাড়ি করে নিয়েছিল। ও বলত, এই চোরাই সময়টা
অবৈধ বলেই ঘুমের পক্ষে সব চেয়ে অনুকূল।

কিন্তু আজকাল ওর ঘুমটা আর অবিমিশ্র নয়। সকাল সকাল
জাগবার একটা আগ্রহ তার অন্তর্নিহিত। প্রয়োজনের
আগেই ঘুম ভাঙে-- তার পরে পাশ ফিরে শুতে সাহস হয় না,
পাছে বেলা হয়ে যায়। মাঝে মাঝে ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে দিয়েছে;
কিন্তু সময় চুরির অপরাধ ধরা পড়বার ভয়ে সেটা বার বার করা
সম্ভব হত না। আজ একবার ঘড়ির দিকে চাইলে, দেখলে,
বেলা এখনো সাতটার এ পারেই। মনে হল, ঘড়ি নিশ্চয় বন্ধ।
কানের কাছে নিয়ে শুনলে টিকটিক শব্দ।

এমন সময় চমকে উঠে দেখে, ডান হাতে ছাতা দোলাতে
দোলাতে উপরের রাস্তা দিয়ে আসছে লাবণ্য। সাদা শাড়ি,
পিঠে কালো রঙের তিনকোণা শাল, তাতে কালো ঝালর।
অমিতর বুঝতে বাকি নেই যে, লাবণ্যর অর্ধেক দৃষ্টিতে সে
গোচর হয়েছে, কিন্তু পূর্ণদৃষ্টিতে সেটাকে মোকাবিলায় কবুল
করতে লাবণ্য নারাজ। বাঁকের মুখ পর্যন্ত লাবণ্য যেই গেছে,
অমিত আর থাকতে পারলে না, দৌড়তে দৌড়তে তার পাশে
উপস্থিত।

বললে, "জানতেন এড়াতে পারবেন না, তবু দৌড় করিয়ে
নিলেন। জানেন না কি, দূরে চলে গেলে কতটা অসুবিধা হয়।"

"কিসের অসুবিধা।"

অমিত বললে, "যে হতভাগা পিছনে পড়ে থাকে তার প্রাণটা
ঊর্ধ্বস্বরে ডাকতে চায়। কিন্তু ডাকি কী বলে। দেবদেবীদের
নিয়ে সুবিধে এই যে, নাম ধরে ডাকলেই তাঁরা খুশি। দুর্গা
দুর্গা বলে গর্জন করতে থাকলেও ভগবতী দশভুজা অসন্তুষ্ট
হন না। আপনাদের নিয়ে যে মুশকিল।"

"না ডাকলেই চুকে যায়।"

"বিনা সম্বোধনেই চালাই যখন কাছে থাকেন। তাই তো বলি,
দূরে যাবেন না। ডাকতে চাই অথচ ডাকতে পারি নে, এর চেয়ে
দুঃখ আর নেই।"

"কেন, বিলিতি কায়দা তো আপনার অভ্যাস আছে।"

"মিস ডাট? সেটা চায়ের টেবিলে। দেখুন-না, আজ এই
আকাশের সঙ্গে পৃথিবী যখন সকালের আলোয় মিলল, সেই
মিলনের লগ্নটি সার্থক করবার জন্যে উভয়ে মিলে একটি রূপ
সৃষ্টি করলে, তারই মধ্যে রয়ে গেল স্বর্গমর্তের ডাকনাম।
মনে হচ্ছে না কি, একটা নাম ধরে ডাকা উপর থেকে নীচে
আসছে, নীচে থেকে উপরে উঠে চলেছে। মানুষের জীবনেও কি
ঐ রকমের নাম সৃষ্টি করবার সময় উপস্থিত হয় না। কল্পনা
করুন-না, যেন এখনই প্রাণ খুলে গলা ছেড়ে আপনাকে ডাক
দিয়েছি, নামের ডাক বনে বনে ধ্বনিত হল, আকাশের ঐ রঙিন
মেঘের কাছ পর্যন্ত পৌঁছল, সামনের ঐ পাহাড়টা তাই শুনে
মাথায় মেঘ মুড়ি দিয়ে দাঁড়িয়ে ভাবতে লাগল। মনে ভাবতেও
কি পারেন সেই ডাকটা মিস ডাট।"

লাবণ্য কথাটাকে এড়িয়ে বললে, "নামকরণে সময় লাগে,
আপাতত বেড়িয়ে আসি গে।"

অমিত তার সঙ্গ নিয়ে বললে, "চলতে শিখতেই মানুষের দেরি
হয়, আমার হল উলটো। এতদিন পরে এখানে এসে তবে
বসতে শিখেছি। ইংরেজিতে বলে, গড়ানে পাথরের কপালে
শ্যাওলা জোটে না-- সেই ভেবেই অন্ধকার থাকতে কখন
থেকে পথের ধারে বসে আছি। তাই তো ভোরের আলো
দেখলুম।"

লাবণ্য কথাটাকে তাড়াতাড়ি চাপা দিয়ে জিজ্ঞাসা করলে, "ঐ
সবুজ ডানাওয়ালা পাখিটার নাম জানেন?"

অমিত বললে, "জীবজগতে পাখি আছে সেটা এতদিন
সাধারণভাবেই জানতুম, বিশেষভাবে জানবার সময় পাই নি।
এখানে এসে, আশ্চর্য এই যে, স্পষ্ট জানতে পেরেছি, পাখি
আছে, এমন-কি, তারা গানও গায়।"

লাবণ্য হেসে উঠে বললে, "আশ্চর্য!"

অমিত বললে, "হাসছেন! আমার গভীর কথাতেও গাম্ভীর্য
রাখতে পারি নে। ওটা মুদ্রাদোষ। আমার জন্মলগ্নে আছে
চাঁদ, ঐ গ্রহটি কৃষ্ণচতুর্দশীর সর্বনাশা রাত্রেও একটুখানি
মুচকে না হেসে মরতেও জানে না।"

লাবণ্য বললে, "আমাকে দোষ দেবেন না। বোধ হয় পাখিও
যদি আপনার কথা শুনত, হেসে উঠত।"

অমিত বললে, "দেখুন, আমার কথা লোকে হঠাৎ বুঝতে পারে
না বলেই হাসে, বুঝতে পারলে চুপ করে বসে ভাবত। আজ
পাখিকে নতুন করে জানছি এ কথায় লোকে হাসছে। কিন্তু এর
ভিতরের কথাটা হচ্ছে এই যে, আজ সমস্তই নতুন করে
জানছি, নিজেকেও। এর উপরে তো হাসি চলে না। ঐ দেখুন-
না, কথাটা একই, অথচ এইবার আপনি একেবারেই চুপ।"

লাবণ্য হেসে বললে, "আপনি তো বেশিদিনের মানুষ না, খুবই
নতুন, আরো নতুনের ঝোঁক আপনার মধ্যে আসে কোথা
থেকে।"

"এর জবাবে খুব-একটা গম্ভীর কথাই বলতে হল যা চায়ের
টেবিলে বলা চলে না। আমার মধ্যে নতুন যেটা এসেছে সেটাই
অনাদিকালের পুরোনো, ভোরবেলাকার আলোর মতোই সে
পুরোনো, নতুন-ফোটা ভুইচাঁপা ফুলেরই মতো, চিরকালের
জিনিস নতুন করে আবিষ্কার।"

কিছু না বলে লাবণ্য হাসলে।

অমিত বললে, "আপনার এবারকার এই হাসিটি পাহারাওয়ালার
চোর-ধরা গোল লণ্ঠনের হাসি। বুঝেছি, আপনি যে কবির
ভক্ত তার বই থেকে আমার মুখের এ কথাটা আগেই পড়ে
নিয়েছেন। দোহাই আপনার, আমাকে দাগি চোর ঠাওরাবেন না।
এক এক সময়ে এমন অবস্থা আসে, মনের ভিতরটা
শংকরাচার্য হয়ে ওঠে; বলতে থাকে, আমিই লিখেছি কি আর
কেউ লিখেছে এই ভেদজ্ঞানটা মায়া। এই দেখুন-না, আজ
সকালে বসে হঠাৎ খেয়াল গেল, আমার জানা সাহিত্যের ভিতর
থেকে এমন একটা লাইন বের করি যেটা মনে হবে এইমাত্র
স্বয়ং আমি লিখলুম, আর কোনো কবির লেখবার সাধ্যই ছিল
না।"

লাবণ্য থাকতে পারলে না, প্রশ্ন করলে, "বের করতে
পেরেছেন?"

"হাঁ, পেরেছি।"

লাবণ্যর কৌতূহল আর বাধা মানল না, জিজ্ঞাসা করে
ফেললে, "লাইনটা কী বলুন-না।"

"For Gods sake, hold your tongue
and let me love! "

লাবণ্যর বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠল।

অনেকক্ষণ পরে অমিত জিজ্ঞাসা করলে, "আপনি নিশ্চয়
জানেন লাইনটা কার।"

লাবণ্য একটু মাথা বেঁকিয়ে ইশারায় জানিয়ে দিলে, হাঁ।

অমিত বললে, "সেদিন আপনার টেবিলে ইংরেজ কবি ডনের বই
আবিষ্কার করলুম, নইলে এ লাইন আমার মাথায় আসত না।"

"আবিষ্কার করলেন?"

"আবিষ্কার নয় তো কী। বইয়ের দোকানে বই চোখে পড়ে,
আপনার টেবিলে বই প্রকাশ পায়। পাব্লিক লাইব্রেরির টেবিল
দেখেছি, সেটা তো বইগুলিকে বহন করে; আপনার টেবিল
দেখলুম, সে যে বইগুলিকে বাসা দিয়েছে। সেদিন ডনের
কবিতাকে প্রাণ দিয়ে দেখতে পেয়েছি। মনে হল, অন্য কবির
দরজায় ঠেলাঠেলি ভিড়, বড়োলোকের শ্রাদ্ধে কাঙালি-বিদায়ের
মতো। ডনের কাব্যমহল নির্জন, ওখানে দুটি মানুষ পাশাপাশি
বসবার জায়গাটুকু আছে। তাই অমন স্পষ্ট করে শুনতে পেলুম
আমার সকালবেলাকার মনের কথাটি--

দোহাই তোদের, একটুকু চুপ কর্।
ভালোবাসিবারে দে আমারে অবসর।"

লাবণ্য বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলে, "আপনি বাংলা কবিতা
লেখেন নাকি।"

"ভয় হচ্ছে, আজ থেকে লিখতে শুরু করব-বা। নতুন অমিত
রায় কী-যে কাণ্ড করে বসবে, পুরোনো অমিত রায়ের তা কিছু
জানা নেই। হয়তো-বা সে এখনই লড়াই করতে বেরোবে।"

"লড়াই? কার সঙ্গে।"

"সেইটে ঠিক করতে পারছি নে। কেবলই মনে হচ্ছে, খুব
মস্ত কিছু একটার জন্যে এক্খুনি চোখ বুঝে প্রাণ দিয়ে ফেলা
উচিত, তার পরে অনুতাপ করতে হয় রয়ে বসে করা যাবে।"

লাবণ্য হেসে বললে, "প্রাণ যদি দিতেই হয় তো সাবধানে
দেবেন।"

"সে কথা আমাকে বলা অনাবশ্যক। কম্যুন্যাল রায়টের মধ্যে
আমি যেতে নারাজ। মুসলমান বাঁচিয়ে, ইংরেজ বাঁচিয়ে চলব।
যদি দেশি বুড়োসুড়ো গোছের মানুষ, অহিংস্র মেজাজের
ধার্মিক চেহারা, শিঙে বাজিয়ে মোটর হাঁকিয়ে চলেছে, তার
সামনে দাঁড়িয়ে পথ আটকিয়ে বলব "যুদ্ধং দেহি'-- ঐ যে-
লোক অজীর্ণ রোগ সারবার জন্যে হাসপাতালে না গিয়ে এমন
পাহাড়ে আসে, খিদে বাড়াবার জন্যে নির্লজ্জ হয়ে হাওয়া
খেতে বেরোয়।"

লাবণ্য হেসে বললে, "লোকটা তবু যদি অমান্য করে চলে
যায়?"

"তখন আমি পিছন থেকে দু হাত আকাশে তুলে বলব,
এবারকার মতো ক্ষমা করলুম, তুমি আমার ভ্রাতা, আমরা
এক ভারতমাতার সন্তান।-- বুঝতে পারছেন, মন যখন খুব
বড়ো হয়ে ওঠে তখন মানুষ যুদ্ধও করে, ক্ষমাও করে।"

লাবণ্য হেসে বললে, "আপনি যখন যুদ্ধের প্রস্তাব
করেছিলেন মনে ভয় হয়েছিল, কিন্তু ক্ষমার কথা যেরকম
বোঝালেন তাতে আশ্বস্ত হলুম যে ভাবনা নেই।"

অমিত বললে, "আমার একটা অনুরোধ রাখবেন?"

"কী, বলুন।"

"আজ খিদে বাড়াবার জন্যে আর বেশি বেড়াবেন না।"

"আচ্ছা, বেশ, তার পরে?"

"ঐ নীচে গাছতলায় যেখানে নানা রঙের ছ্যাতলা পড়া পাথরটার
নীচে দিয়ে একটুখানি জল ঝির্ঝির্ করে বয়ে যাচ্ছে ঐখানে
বসবেন আসুন।"

লাবণ্য হাতে-বাঁধা ঘড়িটার দিকে চেয়ে বললে, "কিন্তু সময়
যে অল্প।"

"জীবনে সেইটেই তো শোচনীয় সমস্যা, লাবণ্যদেবী, সময়
অল্প। মরুপথে সঙ্গে আছে আধ-মশক মাত্র জল। যাতে
সেটা উছলে উছলে শুকনো ধুলোয় মারা না যায় সেটা নিতান্তই
করা চাই। সময় যাদের বিস্তর তাদেরই পাঙ্ক্চুয়াল হওয়া
শোভা পায়। দেবতার হাতে সময় অসীম তাই ঠিক সময়টিতে
সূর্য ওঠে, ঠিক সময়ে অস্ত যায়। আমাদের মেয়াদ অল্প,
পাঙ্ক্চুয়াল হতে গিয়ে সময় নষ্ট করা আমাদের পক্ষে
অমিতব্যয়িতা। অমরাবতীর কেউ যদি প্রশ্ন করে "ভবে এসে
করলে কী' তখন কোন্ লজ্জায় বলব, "ঘড়ির কাঁটার দিকে
চোখ রেখে কাজ করতে করতে জীবনের যা-কিছু সকল সময়ের
অতীত তার দিকে চোখ তোলবার সময় পাই নি।' তাই তো
বলতে বাধ্য হলুম, চলুন ঐ জায়গাটাতে।"

ওর যেটাতে আপত্তি নেই সেটাতে আর কারো যে আপত্তি
থাকতে পারে অমিত সেই আশঙ্কাটাকে একেবারে উড়িয়ে দিয়ে
কথাবার্তা কয়। সেইজন্যে তার প্রস্তাবে আপত্তি করা
শক্ত। লাবণ্য বললে, "চলুন।"

ঘনবনের ছায়া। সরু পথ নেমেছে নীচে একটা খাসিয়া গ্রামের
দিকে। অর্ধপথে আর-এক পাশ দিয়ে ক্ষীণ ঝরনার ধারা এক
জায়গায় লোকালয়ের পথটাকে অস্বীকার করে তার উপর দিয়ে
নিজের অধিকারচিহ্নস্বরূপ নুড়ি বিছিয়ে স্বতন্ত্র পথ চালিয়ে
গেছে। সেইখানে পাথরের উপরে দুজনে বসল। ঠিক সেই
জায়গায় খাদটা গভীর হয়ে খানিকটা জল জমে আছে, যেন
সবুজ পর্দার ছায়ায় একটি পর্দানশীন মেয়ে, বাইরে পা
বাড়াতে তার ভয়। এখানকার নির্জনতার আবরণটাই লাবণ্যকে
নিরাবরণের মতো লজ্জা দিতে লাগল। সামান্য যা তা একটা
কিছু বলে এইটেকে ঢাকা দিতে ইচ্ছে করছে, কিছুতেই কোনো
কথা মনে আসছে না, স্বপ্নে যেরকম কণ্ঠরোধ হয় সেই
দশা।

অমিত বুঝতে পারলে, একটা-কিছু বলাই চাই। বললে, "দেখুন
আর্যা, আমাদের দেশে দুটো ভাষা-- একটা সাধু, আর-একটা
চলতি। কিন্তু এ ছাড়া আরো একটা ভাষা থাকা উচিত ছিল--
সমাজের ভাষা নয়, ব্যবসায়ের ভাষা নয়, আড়ালের ভাষা
এইরকম জায়গার জন্য। পাখির গানের মতো, কবির কাব্যের
মতো সেই ভাষা অনায়াসেই কণ্ঠ দিয়ে বেরোনো উচিত ছিল,
যেমন করে কান্না বেরোয়। সেজন্যে মানুষকে বইয়ের
দোকানে ছুটতে হয় সেটা বড়ো লজ্জা। প্রত্যেকবার হাসির
জন্যে যদি ডেণ্টিস্টের দোকানে দৌড়াদৌড়ি করতে হত তা
হলে কী হত ভেবে দেখুন। সত্যি বলুন লাবণ্যদেবী, এখনই
আপনার সুর করে কথা বলতে ইচ্ছে করছে না?"

লাবণ্য মাথা হেঁট করে চুপ করে বসে রইল।

অমিত বললে, "চায়ের টেবিলের ভাষায় কোন্টা ভদ্র, কোন্টা
অভদ্র, তার হিসেব মিটতে চায় না। কিন্তু এ জায়গায় ভদ্রও
নেই অভদ্রও নেই। তা হলে কী উপায় বলুন। মনটাকে সহজ
করবার জন্যে একটা কবিতা না আওড়ালে তো চলছে না।
গদ্যে অনেক সময় নেয়, অত সময় তো হাতে নেই। যদি
অনুমতি করেন তো আরম্ভ করি।"

দিতে হল অনুমতি, নইলে লজ্জা করতে গেলেই লজ্জা।

অমিত ভূমিকায় বললে, "রবি ঠাকুরের কবিতা বোধ হয়
আপনার ভালো লাগে।"

"হাঁ, লাগে।"

"আমার লাগে না। অতএব আমাকে মাপ করবেন। আমার
একজন বিশেষ কবি আছে; তার লেখা এত ভালো যে, খুব
অল্প লোকেই পড়ে। এমন-কি, তাকে কেউ গাল দেবার
উপযুক্ত সম্মানও দেয় না। ইচ্ছে করছি আমি তার থেকে
আবৃত্তি করি।"

"আপনি এত ভয় করছেন কেন।"

"এ সম্বন্ধে আমার অভিজ্ঞতা শোকাবহ। কবিবরকে নিন্দে
করলে আপনারা জাতে ঠেলেন, তাকে নিঃশব্দে পাশ কাটিয়ে
বাদ দিয়ে চললে তাতে করেও কঠোর ভাষার সৃষ্টি হয়। যা
আমার ভালো লাগে তাই আর-একজনের ভালো লাগে না, এই
নিয়েই পৃথিবীতে যত রক্তপাত।"

"আমার কাছ থেকে রক্তপাতের ভয় করবেন না। আপন রুচির
জন্যে আমি পরের রুচির সমর্থন ভিক্ষে করি নে।"

"এটা বেশ বলেছেন, তা হলে নির্ভয়ে শুরু করা যাক--

রে অচেনা, মোর মুষ্টি ছাড়াবি কী করে,
যতক্ষণ চিনি নাই তোরে?

বিষয়টা দেখছেন? না-চেনার বন্ধন। সব চেয়ে কড়া বন্ধন।
না-চেনা জগতে বন্দী হয়েছি, চিনে নিয়ে তবে খালাস পাব,
একেই বলে মুক্তিতত্ত্ব।

কোন্ অন্ধক্ষণে
বিজড়িত তন্দ্রা-জাগরণে
রাত্রি যবে সবে হয় ভোর,
মুখ দেখিলাম তোর।
চক্ষু'পরে চক্ষু রাখি শুধালেম, কোথা সংগোপনে
আছ আত্মবিস্মৃতির কোণে।

নিজেকেই ভুলে থাকার মতো কোনো এমন ঝাপসা কোণ আর
নেই। সংসারে কত যে দেখবার ধন দেখা হল না, তারা
আত্মবিস্মৃতির কোণে মিলিয়ে আছে। তাই বলে তো হাল
ছেড়ে দিলে চলে না।

তোর সাথে চেনা
সহজে হবে না--
কানে কানে মৃদুকণ্ঠে নয়।
করে নেব জয়
সংশয়কুণ্ঠিত তোর বাণী--
দৃপ্ত বলে লব টানি
শঙ্কা হতে, লজ্জা হতে, দ্বিধা দ্বন্দ্ব হতে
নির্দয় আলোতে।

একেবারে নাছোড়বান্দা। কতবড়ো জোর। দেখেছেন রচনার
পৌরুষ।

                              জাগিয়া উঠিবি অশ্রুধারে,
                              মুহূর্তে চিনিবি আপনারে,
                                   ছিন্ন হবে ডোর--
                               তোর মুক্তি দিয়ে তবে মুক্তি হবে মোর।

ঠিক এই তানটি আপনার নামজাদা লেখকের মধ্যে পাবেন না,
সূর্যমণ্ডলে এ যেন আগুনের ঝড়। এ শুধু লিরিক নয়, এ
নিষ্ঠুর জীবনতত্ত্ব।"-- লাবণ্যর মুখের দিকে একদৃষ্টিতে
চেয়ে বললে--

"হে অচেনা,
দিন যায়, সন্ধ্যা হয়, সময় রবে না,
তীব্র আকস্মিক
বাধা বন্ধ ছিন্ন করি দিক,
তোমারে চেনার অগ্নি দীপ্তশিখা উঠুক উজ্জ্বলি,
দিব তাহে জীবন অঞ্জলি।"

আবৃত্তি শেষ হতে-না-হতেই অমিত লাবণ্যর হাত চেপে
ধরলে। লাবণ্য হাত ছাড়িয়ে নিলে না। অমিতর মুখের দিকে
চাইলে, কিছু বললে না।

এর পরে কোনো কথা বলবার কোনো দরকার হল না। লাবণ্য
ঘড়ির দিকে চাইতেও ভুলে গেল।
-