>> অনন্ত জীবন <<
প্রভাত সংগীত
— রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
-
অধিক করি না আশা, কিসের বিষাদ
জনমেছি দুদিনের তরে,
যাহা মনে আসে তাই আপনার মনে
গান গাই আনন্দের ভরে।
এ আমার গানগুলি দুদণ্ডের গান,
র'বে না র'বে না চিরদিন,
পুরব আকাশ হতে উঠিবে উচ্ছ্বাস,
পশ্চিমেতে হইবে বিলীন।
তা ব’লে নয়নে কেন ওঠে অশ্রুজল—
কেন তোর দুঃখের নিশ্বাস,
গীত গান বন্ধ ক’রে রয়েছিস বসে
কেন ওরে হৃদয় হতাশ।
আনন্দের প্রাণ তোর, আনন্দের গান,
সাঙ্গ তাহা করিসনে আজ—
যখন যা মনে হবে উঠিবি গাহিয়া
এই শুধু—এই তোর কাজ।
একবার ভেবে দেখ্—ভেবে দেখ্ মন
পৃথিবীতে পাখি কেন গায়;
জাগিয়া দেখে সে চেয়ে প্রভাত কিরণ
আকাশেতে উথলিয়া যায়;
অমনি নয়নে ফোটে আনন্দের আলো,
কণ্ঠ তুলি মনের উচ্ছ্বাসে
সংগীতনির্ঝরস্রোতে ঢেলে দেয় প্রাণ—
ঢেলে দেয় অনন্ত আকাশে।
কনক মেঘেতে যেন খেলাবার তরে
গানগুলি ছুটে বাহু তুলি
প্রিয়তমা পাশে বসি—বুকের কাছেতে
ঘেঁসে আসে ছোটো ছানাগুলি।
কাল গান ফুরাইবে, তা ব'লে গাবে না কেন,
আজ যবে হয়েছে প্রভাত।
আজ যবে জ্বলিছে শিশির
আজ যবে কুসুম কাননে
বহিয়াছে বিমল সমীর।
আজ যবে ফুটেছে কুসুম,
নলিনীর ভাঙিয়াছে ঘুম,
পল্লবের শ্যামল-হিল্লোল,
তটিনীতে উঠেছে কল্লোল,
নয়নেতে মোহ লাগিয়াছে,
পরানেতে প্রেম জাগিয়াছে।
তোরা ফুল, তোরা পাখি, তোরা খোলা প্রাণ,
জগতের আনন্দ যে তোরা,
জগতের বিষাদ-পাসরা।
পৃথিবীতে উঠিয়াছে আনন্দ-লহরী
তোরা তার একেকটি ঢেউ,
কখন্ উঠিলি আর কখন্ মিলালি
জানিতেও পারিল না কেউ।
কত শত উঠিতেছে, যেতেছে টুটিয়া
কে বলে রাখিবে তাহা মনে;
তা ব’লে কি সাধ যায় লুকাইতে প্রাণ
সূর্যহীন আঁধার মরণে।
যা হবে তা হবে মোর, কিসের ভাবনা,
রাখি শুধু মুহূর্তের আশ,
আনন্দ সাগরে সেই হইয়া একটি ঢেউ
মূহূর্তেই পাইব বিনাশ।
প্রতিদিন কত শত ফুটে ওঠে ফুল,
প্রতিদিন ঝরে পড়ে যায়,
ফুল-বাস মুহূর্তে ফুরায়।
প্রতিদিন কত শত পাখি গান গায়,
গান তার শূন্যেতে মিশায়।
ভেসে যায় শত ফুল, ভেসে যায় বাস,
ভেসে যায় শত শত গান—
তারি সাথে, তারি মাঝে দেহ এলাইয়া
ভেসে যাবি তুই মোর প্রাণ।
তুই ফুরাইয়া গেলে গান ফুরাইবে,
কত সহে সংগীতের প্রাণে।
আবার নূতন কবি এই উপবনে,
আসিয়া বসিবে এই খানে।
তোরি মতো রহিবে সে পুরবে চাহিয়া,
দেখিবে সে উষার বিকাশ,
অমনি আপনা হতে হৃদয় উথলি
উঠিবেক গানের উচ্ছ্বাস।
তুই যাবি, সেও যাবে, একেকটি পাখি,
একেকটি সংগীতের কণা,
তা বলিয়া—যতদিন রবি শশী আছে
জগতের গান ফুরাবে না;
তবে আর কিসের ভাবনা।
গারে গান প্রভাত-কিরণে।
যারা তোর প্রাণসখা, যারা তোর প্রিয়তম
ওই তারা কাছে ব’সে শোনে।
নাই তোর নাইরে ভাবনা,
এ জগতে কিছুই মরে না।
নদীস্রোতে কোটি কোটি মৃত্তিকার কণা,
ভেসে আসে, সাগরে মিশায়,
জানো না কোথায় তারা যায়!
একেকটি কণা লয়ে গোপনে সাগর
রচিছে বিশাল মহাদেশ,
না জানি কবে তা হবে শেষ।
মুহূর্তেই ভেসে যায় আমাদের গান,
জানো না তো কোথায় তা যায়
আকাশের সাগর সীমায়।
আকাশ-সমুদ্র-তলে গোপনে গোপনে
গীতরাজ্য হতেছে সৃজন,
যত গান উঠিতেছে ধরার আকাশে
সেইখানে করিছে গমন।
আকাশ পূরিয়া যাবে শেষ,
উঠিবে গানের মহাদেশ।
করিব গানের মাঝে বাস,
লইব রে গানের নিশ্বাস,
ঘুমাইব গানের মাঝারে,
বহে যাবে গানের বাতাস।
নাই তোর নাইরে ভাবনা,
এ জগতে কিছুই মরে না।
প্রাণপণে ভালবাসা ক'রে সমর্পণ
ফিরে তাহা পেলিনে না হয়—
বৃথা নহে নিরাশ-প্রণয়।
নিমেষের মোহে জন্মে যে প্রেম উচ্ছ্বাস
নিমেষেই করে পলায়ন,
সেও কভু জানে না মরণ।
জগতের তলে তলে তিলে তিলে পলে পলে
প্রেমরাজ্য হতেছে সৃজন,
সেথায় সে করিছে গমন।
কাল দেখেছিনু পথে হরষে খেলিতেছিল
দুটি ভাই গলাগলি করি;
দেখেছিনু জানালায় নীরবে দাঁড়ায়েছিল
দুটি সখা হাতে হাতে ধরি,—
দেখেছিনু কচি মেয়ে মায়ের বাহুতে শুয়ে
ঘুমায়ে করিছে স্তন পান,
ঘুমন্ত মুখের পরে বরষিছে স্নেহ-ধারা
স্নেহমাথা নত দুনয়ান;
দেখেছিনু রাজ পথে চলেছে বালক এক
বৃদ্ধ জনকের হাত ধরি—
কত কী যে দেখেছিনু হয়তো সে সব ছবি
আজ আমি গিয়েছি পাসরি।
তা ব'লে নাহি কি তাহা মনে।
ছবিগুলি মেশেনি জীবনে?
স্মৃতির কণিকা তারা স্মরণের তলে পশি
রচিতেছে জীবন আমার—
কোথা যে কে মিশাইল, কেবা গেল কার পাশে
চিনিতে পারিনে তাহা অার।
হয়তো অনেক দিন দেখেছিনু ছবি এক
দুটি প্রাণী বাহুর বাঁধনে—
তাই আজ ছুটাছুটি এসেছি প্রভাতে উঠি
সখারে বাঁধিতে আলিঙ্গনে।
হয়তো অনেক দিন শুনেছিনু পাখি এক
আনন্দে গাহিছে প্রাণ খুলি,
সহসা রে তাই আজ প্রভাতের মুখ দেখি
প্রাণ মন উঠিছে উখুলি।
সকলি মিশিছে আসি হেথা,
জীবনে কিছু না যায় ফেলা,
এই যে যা কিছু চেয়ে দেখি
এ নহে কেবলি ছেলেখেলা ।
এই জগতের মাঝে একটি সাগর আছে
নিস্তব্ধ তাহার জল রাশি,
চারিদিক হতে সেথা অবিরাম অবিশ্রাম
জীবনের স্রোত মিশে আসি।
সূর্য হতে ঝরে ধারা, চন্দ্র হতে ঝরে ধারা
কোটি কোটি তারা হতে ঝরে,
জগতের যত হাসি, যত গান, যত প্রাণ
ভেসে অাসে সেই স্রোতোভরে,
মেশে আসি সেই সিন্ধু পরে।
পৃথ্বি হতে মহাশ্রোত ছুটিতেছে অবিরাম
সেই মহাসাগর-উদ্দেশে;
আমরা মাটির কণা জলস্রোত ঘোলা করি
অবিশ্রাম চলিয়াছি ভেসে
সাগরে পড়িব অবশেষে।
জগতের মাঝখানে, সেই সাগরের তলে
রচিত হতেছে পলে পলে,
অনন্ত-জীবন মহাদেশ;
কে জানে হবে কি তাহা শেষ।
তাই বলি প্রাণ ওরে—মরণের ভয় করে
কেনরে আছিস ম্রিয়মাণ
সমাপ্ত করিয়া গীত গান।
গান গা' পাখির মতো, ফোট্রে ফুলের প্রায়,
ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দুঃখ শোক ভুলি—
তুই যাবি, গান যাবে, এক সাথে ভেসে যাবে
তুই, আর তোর গানগুলি।
মিশিবি সে সিন্ধুজলে অনন্ত সাগর তলে,
এক সাথে শুয়ে র'বি প্রাণ,
তুই, আর তোর এই গান।
Wednesday, May 9, 2018
অনন্ত জীবন - অধিক করি না আশা, কিসের বিষাদ
Monday, April 2, 2018
আলোর অমল কমলখানি কে ফুটালে
আলোর অমল কমলখানি কে ফুটালে,
নীল আকাশের ঘুম ছুটালে॥
আমার মনের ভাব্নাগুলি বাহির হল পাখা
তুলি,
ওই কমলের পথে তাদের সেই জুটালে॥
শরতবাণীর বীণা বাজে কমলদলে।
ললিত রাগের সুর ঝরে তাই শিউলিতলে।
তাই তো বাতাস বেড়ায় মেতে কচি ধানের
সবুজ ক্ষেতে,
বনের প্রাণে মর্মরানির ঢেউ উঠালে॥
-
রাগ: রামকেলী
তাল: দাদরা
রচনাকাল (বঙ্গাব্দ): ফাল্গুন, ১৩৩৩
রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ): 1927
স্বরলিপিকার: দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর
Wednesday, February 28, 2018
মধুর বসন্ত এসেছে মধুর মিলন ঘটাতে
মধুর বসন্ত এসেছে মধুর মিলন ঘটাতে।
মধুর মলয়-সমীরে মধুর মিলন রটাতে॥
কুহক লেখনী ছুটায়ে কুসুম তুলিছে ফুটায়ে,
লিখিছে প্রণয়-কাহিনী বিবিধ বরন-ছটাতে।
হেরো পুরানো প্রাচীন ধরণী হয়েছে শ্যামলবরনী,
যেন যৌবন-প্রবাহ ছুটিছে কালের শাসন টুটাতে;
পুরানো বিরহ হানিছে, নবীন মিলন আনিছে,
নবীন বসন্ত আইল নবীন জীবন ফুটাতে॥
-
রাগ: বাহার
তাল: কাহারবা
রচনাকাল (বঙ্গাব্দ): অগ্রহায়ণ, ১২৯৫
রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ): 1888
রচনাস্থান: কলকাতা, দার্জিলিং
স্বরলিপিকার: ইন্দিরা দেবী
ওরে মাঝি, ওরে আমার মানবজন্মতরীর মাঝি
ওরে মাঝি, ওরে আমার মানবজন্মতরীর মাঝি,
শুনতে কি পাস দূরের থেকে পারের বাঁশি উঠছে বাজি॥
তরী কি তোর দিনের শেষে ঠেকবে এবার ঘাটে এসে।
সেথায় সন্ধ্যা-অন্ধকারে দেয় কি দেখা প্রদীপরাজি॥
যেন আমার লাগে মনে মন্দ-মধুর এই পবনে
সিন্ধুপারের হাসিটি কার আঁধার বেয়ে আসছে আজি।
আসার বেলায় কুসুমগুলি কিছু এনেছিলেম তুলি,
যেগুলি তার নবীন আছে এই বেলা নে সাজিয়ে সাজি॥
-
রাগ: শ্রী
তাল: একতাল
রচনাকাল (বঙ্গাব্দ): ১৭ শ্রাবণ, ১৩১৭
রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ): 1910
রচনাস্থান: বোলপুর
স্বরলিপিকার: সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
Thursday, February 1, 2018
চরণ ধরিতে দিয়ো গো আমারে
চরণ ধরিতে দিয়ো গো আমারে
নিয়ো না নিয়ো না সরায়ে।
জীবণ মরণ সুখ দুখ দিয়ে
বক্ষে ধরিব জড়ায়ে॥
স্খলিত শিথিল কামনার ভার
বহিয়া বহিয়া ফিরি কত আর,
নিজ হাতে তুমি গেঁথে নিয়ো হার,
ফেলো না আমারে ছড়ায়ে॥
বিকায়ে বিকায়ে দীন আপনারে
পারি না ফিরিতে দুয়ারে দুয়ারে,
তোমার করিয়া নিয়ো গো আমারে
বরণের মালা পরায়ে॥
হৃদয় বসন্তবনে যে মাধুরী বিকাশিল
হৃদয় বসন্তবনে যে মাধুরী বিকাশিল
সেই প্রেম সেই মালিকায় রূপ নিল,
রূপ নিল।
এই ফুলহারে প্রেয়সী তোমারে
বরণ করি
অক্ষয় মধুর সুধাময়
হোক মিলনবিভাবরী।
প্রেয়সী তোমায় প্রাণবেদিকায়
প্রেমের পূজায় বরণ করি॥
কহো কহো মোরে প্রিয়ে,
আমারে করেছ মুক্ত কী সম্পদ দিয়ে।
অয়ি বিদেশিনী,
তোমার কাছে আমি কত ঋণে ঋণী।
Saturday, December 23, 2017
আমি যখন ছিলেম অন্ধ
আমি যখন ছিলেম অন্ধ,
সুখের খেলায় বেলা গেছে পাই নি তো আনন্দ।
খেলা ঘরের দেয়াল গেঁথে
খেয়াল নিয়ে ছিলেম মেতে,
ভিত ভেঙে যেই আসলে ঘরে
ঘুচল আমার বন্ধ,
সুখের খেলা আর রোচে না
পেয়েছি আনন্দ॥
ভীষণ আমার, রুদ্র আমার,
নিদ্রা গেল ক্ষুদ্র আমার,
উগ্র ব্যথায় নূতন ক'রে
বাঁধলে আমার ছন্দ।
যেদিন তুমি অগ্নিবেশে
সব-কিছু মোর নিলে এসে,
সেদিন আমি পূর্ণ হলেম ঘুচল আমার দ্বন্দ্ব,
দুঃখ সুখের পারে তোমায় পেয়েছি আনন্দ॥
-
রাগ: কীর্তন
তাল: তেওরা
রচনাকাল (বঙ্গাব্দ): শ্রাবণ, ১৩৩৯
রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ): 1932
স্বরলিপিকার: শৈলজারঞ্জন মজুমদার
Tuesday, November 7, 2017
বড়ো বিস্ময় লাগে হেরি তোমারে
বড়ো বিস্ময় লাগে হেরি তোমারে।
কোথা হতে এলে তুমি হৃদিমাঝারে॥
ওই মুখ ওই হাসি কেন এত ভালোবাসি,
কেন গো নীরবে ভাসি অশ্রুধারে॥
তোমারে হেরিয়া যেন জাগে স্মরণে
তুমি চিরপুরাতন চিরজীবনে।
তুমি না দাঁড়ালে আসি হৃদয়ে বাজে না বাঁশি—
যত আলো যত হাসি ডুবে আঁধারে॥
Thursday, September 21, 2017
আমি আশায় আশায় থাকি
আমি আশায় আশায় থাকি।
আমার তৃষিত-আকুল আঁখি॥
ঘুমে-জাগরণে-মেশা প্রাণে স্বপনের নেশা--
দূর দিগন্তে চেয়ে কাহারে ডাকি॥
বনে বনে করে কানাকানি অশ্রুত বাণী,
কী গাহে পাখি।
কী কব না পাই ভাষা, মোর জীবন রঙিন
কুয়াশা ফেলেছে ঢাকি।
-
রাগ: কাফি-কানাড়া
তাল: কাহারবা
রচনাকাল (বঙ্গাব্দ): 1346
রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ): 1939
স্বরলিপিকার: শৈলজারঞ্জন মজুমদার
Wednesday, September 20, 2017
মোর বীণা ওঠে কোন্ সুরে বাজি
মোর বীণা ওঠে কোন্ সুরে বাজি
কোন্ নব চঞ্চল ছন্দে।
মম অন্তর কম্পিত আজি নিখিলের হৃদয়স্পন্দে॥
আসে কোন্ তরুণ অশান্ত, উড়ে বসনাঞ্চলপ্রান্ত,
আলোকের নৃত্যে বনান্ত মুখরিত অধীর আনন্দে।
অম্বরপ্রাঙ্গনমাঝে নিঃস্বর মঞ্জীর গুঞ্জে।
অশ্রুত সেই তালে বাজে করতালি পল্লবপুঞ্জে।
কার পদপরশন-আশা তৃণে তৃণে অর্পিল ভাষা,
সমীরণ বন্ধনহারা উন্মন কোন্ বনগন্ধে॥
-
রাগ: ভৈরবী
তাল: কাহারবা
রচনাকাল (বঙ্গাব্দ): বৈশাখ, ১৩২৬
রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ): 1919
রচনাস্থান: শান্তিনিকেতন
স্বরলিপিকার: দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর
আমার সকল দুখের প্রদীপ
আমার সকল দুখের প্রদীপ জ্বেলে
দিবস গেলে করব নিবেদন--
আমার ব্যথার পূজা হয় নি সমাপন ॥
যখন বেলা-শেষের ছায়ায় পাখিরা যায়
আপন কুলায়-মাঝে,
সন্ধ্যাপূজার ঘণ্টা যখন বাজে,
তখন আপন শেষ শিখাটি জ্বালবে এ জীবন--
আমার ব্যথার পূজা হবে সমাপন ॥
অনেক দিনের অনেক কথা, ব্যাকুলতা,
বাঁধা বেদন-ডোরে,
মনের মাঝে উঠেছে আজ ভ'রে।
যখন পূজার হোমানলে উঠবে জ্বলে
একে একে তারা,
আকাশ-পানে ছুটবে বাঁধন-হারা,
অস্তরবির ছবির সাথে মিলবে আয়োজন--
আমার ব্যথার পূজা হবে সমাপন ॥
-
রাগ: মিশ্র ভীমপলশ্রী
তাল: কাহারবা
রচনাকাল (বঙ্গাব্দ): আশ্বিন, ১৩২৫
রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ): 1918
স্বরলিপিকার: দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর
Tuesday, September 19, 2017
দিবস রজনী, আমি যেন কার আশায় আশায় থাকি
দিবস রজনী, আমি যেন কার
আশায় আশায় থাকি।
(তাই) চমকিত মন, চকিত শ্রবণ,
তৃষিত আকুল আঁখি।
চঞ্চল হয়ে ঘুরিয়ে বেড়াই,
সদা মনে হয় যদি দেখা পাই,
"কে আসিছে" বলে চমকিয়ে চাই
কাননে ডাকিলে পাখি।
জাগরণে তারে না দেখিতে পাই,
থাকি স্বপনের আশে,
ঘুমের আড়ালে যদি ধরা দেয়,
বাঁধিব স্বপনপাশে।
এত ভালোবাসি, এত যারে চাই,
মনে হয় না তো সে যে কাছে নাই,
যেন এ বাসনা ব্যাকুল আবেগে,
তাহারে আনিবে ডাকি।
-
রাগ: পিলু
তাল: ত্রিতাল
রচনাকাল (বঙ্গাব্দ): অগ্রহায়ণ, ১২৯৫
রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ): 1888
রচনাস্থান: কলকাতা, দার্জিলিং
স্বরলিপিকার: জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর,
ইন্দিরা দেবী
Sunday, September 17, 2017
প্রাণ চায় চক্ষু না চায়
প্রাণ চায় চক্ষু না চায়, মরি
একি তোর দুস্তরলজ্জা।
সুন্দর এসে ফিরে যায়, তবে
কার লাগি মিথ্যা এ সজ্জা॥
মুখে নাহি নিঃসরে ভাষ, দহে
অন্তরে নির্বাক বহ্নি।
ওষ্ঠে কী নিষ্ঠুর হাস, তব
মর্মে যে ক্রন্দন তন্বী!
মাল্য যে দংশিছে হায়, তব
শয্যা যে কণ্টকশয্যা
মিলনসমুদ্রবেলায় চির-বিচ্ছেদজর্জর মজ্জা॥
-
রাগ: ভৈরবী-বাউল
তাল: ত্রিতাল
রচনাকাল (বঙ্গাব্দ): 1321
রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ): 1914
Tuesday, September 12, 2017
তোমায় গান শোনাব
তোমায় গান শোনাব তাই তো আমায় জাগিয়ে রাখ
ওগো ঘুম-ভাঙানিয়া
বুকে চমক দিয়ে তাই তো ডাক'
ওগো দুখজাগানিয়া ॥
এল আঁধার ঘিরে, পাখি এল নীড়ে,
তরী এল তীরে
শুধু আমার হিয়া বিরাম পায় নাকো
ওগো দুখজাগানিয়া ॥
আমার কাজের মাঝে মাঝে
কান্নাহাসির দোলা তুমি থামতে দিলে না যে।
আমার পরশ ক'রে প্রাণ সুধায় ভ'রে
তুমি যাও যে সরে--
বুঝি আমার ব্যথার আড়ালেতে দাঁড়িয়ে থাক
ওগো দুখজাগানিয়া ॥
-
রাগ: পিলু
তাল: কাহারবা
রচনাকাল (বঙ্গাব্দ): ২৯ ফাল্গুন, ১৩২৯
রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ): ১৩ মার্চ, ১৯২৩
রচনাস্থান: আমেদাবাদ
স্বরলিপিকার: দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর
ভালোবেসে দুখ সে ও সুখ
ভালোবেসে দুখ সে-ও সুখ, সুখ নাহি আপনাতে।
না না না, সখা, ভুলি নে ছলনাতে।
মন দাও দাও দাও সখী দাও পরের হাতে।
না না না, মোরা ভুলি নে ছলনাতে।
সুখের শিশির নিমেষে শুকায়, সুখ চেয়ে দুখ ভালো,
আনো, সজল বিমল প্রেম ছল ছল নলিন নয়ন-পাতে।
না না না, মোরা ভুলি নে ছলনাতে।
রবির কিরণে ফুটিয়া নলিনী আপনি টুটিয়া যায়,
সুখ পায় তায় সে।
চির-কলিকা-জনম, কে করে বহন চির-শিশির রাতে।
না না না, মোরা ভুলি নে ছলনাতে।
-
রাগ: পিলু-ভীমপলশ্রী-কীর্তন
তাল: একতাল
রচনাকাল (বঙ্গাব্দ): অগ্রহায়ণ, ১২৯৫
রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ): 1888
রচনাস্থান: কলকাতা, দার্জিলিং
স্বরলিপিকার: জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর,
ইন্দিরা দেবী
আকাশে আজ কোন্ চরণের আসা যাওয়া
আকাশে আজ কোন্ চরণের আসা-যাওয়া
বাতাসে আজ কোন্ পরশের লাগে হাওয়া ॥
অনেক দিনের বিদায়বেলায় ব্যাকুল বাণী
আজ উদাসীর বাঁশির সুরে কে দেয় আনি--
বনের ছায়ায় তরুণ চোখের করুণ চাওয়া ॥
কোন্ ফাগুনে যে ফুল ফোটা হল সারা
মৌমাছিদের পাখায় পাখায় কাঁদে তারা।
বকুলতলায় কাজ-ভোলা সেই কোন্ দুপুরে
যে-সব কথা ভাসিয়ে দিলেম গানের সুরে
ব্যথায় ভ'রে ফিরে আসে সে গান-গাওয়া
Monday, September 11, 2017
আমার পরান যাহা চায়
আমার পরান যাহা চায়,
তুমি তাই, তুমি তাই গো।
তোমা ছাড়া আর এ জগতে
মোর, কেহ নাই কিছু নাই গো।
তুমি সুখ যদি নাহি পাও,
যাও, সুখের সন্ধানে যাও,
আমি তোমারে পেয়েছি হৃদয়মাঝে,
আর কিছু নাহি চাই গো।
আমি তোমার বিরহে রহিব বিলীন,
তোমাতে করিব বাস,
দীর্ঘ দিবস, দীর্ঘ রজনী,
দীর্ঘ বরষ মাস।
যদি আর কারে ভালোবাস,
যদি আর ফিরে নাহি আস,
তবে, তুমি যাহা চাও, তাই যেন পাও,
আমি যত দুখ পাই গো।
-
রাগ: পিলু
তাল: ত্রিতাল
রচনাকাল (বঙ্গাব্দ): অগ্রহায়ণ, ১২৯৫
রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ): 1888
রচনাস্থান: কলকাতা, দার্জিলিং
স্বরলিপিকার: ইন্দিরা দেবী, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর
Wednesday, September 6, 2017
ছিন্ন শিকল পায়ে নিয়ে ওরে পাখি
ছিন্ন শিকল পায়ে নিয়ে ওরে পাখি,
যা উড়ে,যা উড়ে,যা রে একাকী।
বাজবে তোর পায়ে সেই বন্ধ,
পাখাতে পাবি আনন্দ—
দিশাহারা মেঘ যে গেল ডাকি।
নির্মল দুঃখে যে সেই তো মুক্তি
নির্মল শূন্যের প্রেমে।
আত্মবিড়ম্বন দারুন লজ্জা,
নিঃশেষে যাক সে থেমে।
দুরাশার মরাবাঁচায় এতদিন ছিলি
তোর খাঁচায়—
ধূলিতলে যাবি রাখি॥
-
রাগ: কাফি
তাল: ষষ্ঠী
রচনাকাল (বঙ্গাব্দ): 1345
রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ): 1938
স্বরলিপিকার: শৈলজারঞ্জন মজুমদার
Monday, September 4, 2017
দাঁড়িয়ে আছ তুমি আমার গানের ও পারে
দাঁড়িয়ে আছ তুমি আমার গানের ও পারে--
আমার সুরগুলি পায় চরণ, আমি পাই নে তোমারে ॥
বাতাস বহে মরি মরি, আর বেঁধে রেখো না তরী--
এসো এসো পার হয়ে মোর হৃদয়মাঝারে ॥
তোমার সাথে গানের খেলা দূরের খেলা যে,
বেদনাতে বাঁশি বাজায় সকল বেলা যে।
কবে নিয়ে আমার বাঁশি বাজাবে গো আপনি আসি
আনন্দময় নীরব রাতের নিবিড় আঁধারে ॥
-
রাগ: ইমন
তাল: ত্রিতাল
রচনাকাল (বঙ্গাব্দ): 1320
রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ): 1914
রচনাস্থান: শান্তিনিকেতন
স্বরলিপিকার: ইন্দিরা দেবী,
দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর
Sunday, September 3, 2017
এত আলো জ্বালিয়েছ এই গগনে
এত আলো জ্বালিয়েছ এই গগনে
কী উৎসবের লগনে॥
সব আলোটি কেমন ক'রে
ফেল আমার মুখের 'পরে,
তুমি আপনি থাকো আলোর পিছনে ॥
প্রেমটি যেদিন জ্বালি হৃদয়-গগনে
কী উৎসবের লগনে
সব আলো তার কেমন ক'রে
পড়ে তোমার মুখের 'পরে,
আমি আপনি পড়ি আলোর পিছনে ॥
-
রাগ: ভৈরবী-বাউল
তাল: কাহারবা
রচনাকাল (বঙ্গাব্দ): 1320
রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ): 1914
রচনাস্থান: শান্তিনিকেতন
স্বরলিপিকার: দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর