Showing posts with label বিচিত্রিতা. Show all posts
Showing posts with label বিচিত্রিতা. Show all posts

Friday, February 26, 2016

যাত্রা - রাজা করে রণযাত্রা, বাজে ভেরি, বাজে করতাল -

যাত্রা
- বিচিত্রিতা
-
রাজা করে রণযাত্রা,
বাজে ভেরি, বাজে করতাল--
কম্পমান বসুন্ধরা।
মন্ত্রী ফেলি ষড়যন্ত্রজাল
রাজ্যে রাজ্যে বাধায় জটিল গ্রন্থি।
বাণিজ্যের স্রোত
ধরণী বেষ্টন করে জোয়ার-ভাঁটায়।
পণ্যপোত
ধায় সিন্ধুপারে-পারে।
বীরকীর্তিস্তম্ভ হয় গাঁথা
লক্ষ লক্ষ মানবকঙ্কালস্তূপে,
ঊর্ধ্বে তুলি মাথা
চূড়া তার স্বর্গ-পানে হানে অট্টহাস।
পণ্ডিতেরা--
আক্রমণ করে বারম্বার
পুঁথির-প্রাচীর-ঘেরা
দুর্ভেদ্য বিদ্যার দুর্গ।
খ্যাতি তার ধায় দেশে দেশে।
হেথা গ্রামপ্রান্তে নদী বহি চলে প্রান্তরের
শেষে
ক্লান্ত স্রোতে।
তরীখানি তুলি লয়ে নববধূটিরে
চলে দূর পল্লী-পানে।
সূর্য অস্ত যায়।
তীরে তীরে
স্তব্ধ মাঠ।
দুরুদুরু বালিকার হিয়া।
অন্ধকারে
ধীরে ধীরে সন্ধ্যাতারা দেখা দেয়
দিগন্তের ধারে।
-
১২ মাঘ, ১৩৩৮

দ্বারে - একা তুমি নিঃসঙ্গ প্রভাতে,

দ্বারে
- বিচিত্রিতা
-
একা তুমি নিঃসঙ্গ প্রভাতে,
অতীতের দ্বার রুদ্ধ তোমার পশ্চাতে।
সেথা হল অবসান
বসন্তের সব দান,
উৎসবের সব বাতি নিবে গেল রাতে।
সেতারের তার হল চুপ,
শুষ্কমালা, ভষ্মশেষ দগ্ধ গন্ধধূপ।
কবরীর ফুলগুলি
ধূলিতে হইল ধূলি,
লজ্জিত সকল সজ্জা বিরস বিরূপ।
সম্মুখে উদাস বর্ণহীন
ক্ষীণছন্দ মন্দগতি তব রাত্রিদিন।
সম্মুখে আকাশ খোলা,
নিস্তব্ধ, সকল-ভোলা--
মত্ততার কলরব শান্তিতে বিলীন।
আভরণহারা তব বেশ,
কজ্জলবিহীন আঁখি, রুক্ষ তব কেশ।
শরতের শেষ মেঘে
দীপ্তি জ্বলে রৌদ্র লেগে,
সেইমতো শোকশুভ্র স্মৃতি-অবশেষ।
তবু কেন হয় যেন বোধ
অদৃষ্ট পশ্চাৎ হতে করে পথরোধ।
ছুটি হল যার কাছে
কিছু তার প্রাপ্য আছে,
নিঃশেষে কি হয় নাই সব পরিশোধ।
সূক্ষ্মতম সেই আচ্ছাদন,
ভাষাহারা অশ্রুহারা অজ্ঞাত কাঁদন।
দুর্লঙ্ঘ্য-যে সেই মানা
স্পষ্ট যারে নেই জানা,
সবচেয়ে সুকঠিন অবন্ধ বাঁধন।
যদি বা ঘুচিল ঘুমঘোর,
অসাড় পাখায় তবু লাগে নাই জোর।
যদি বা দূরের ডাকে
মন সাড়া দিতে থাকে,
তবুও বারণে বাঁধে নিকটের ডোর।
মুক্তিবন্ধনের সীমানায়
এমনি সংশয়ে তব দিন চলে যায়।
পিছে রুদ্ধ হল দ্বার,
মায়া রচে ছায়া তার,
কবে সে মিলাবে আছ সেই প্রতীক্ষায়।
-
১১ মাঘ, ১৩৩৮

ঝাঁকড়াচুল - ঝাঁকড়া চুলের মেয়ের কথা কাউকে বলি নি,

ঝাঁকড়াচুল
- বিচিত্রিতা
-
ঝাঁকড়া চুলের মেয়ের কথা কাউকে বলি নি,
কোন্ দেশে যে চলে গেছে সে-চঞ্চলিনী।
সঙ্গী ছিল কুকুর কালু,
বেশ ছিল তার আলুথালু,
আপনা-'পরে অনাদরে ধুলায় মলিনী।
হুটোপাটি ঝগড়াঝাঁটি ছিল নিষ্কারণেই
দিঘির জলে গাছের ডালে গতি ক্ষণে-ক্ষণেই।
পাগলামি তার কানায় কানায়,
খেয়াল দিয়ে খেলা বানায়,
উচ্চহাসে কলভাষে কলকলিনী।
দেখা হলে যখন-তখন বিনা অপরাধে
মুখভঙ্গী করত আমায় অপমানের ছাঁদে।
শাসন করতে যেমন ছুটি
হঠাৎ দেখি ধুলায় লুটি'
কাজল আঁখি চোখের জলে ছলছলিনী।
আমার সঙ্গে পঞ্চাশবার জন্মশোধের আড়ি
কথায় কথায় নিত্যকালের মতন ছাড়াছাড়ি।
ডাকলে তারে "পুঁটলি' ব'লে
সাড়া দিত মর্জি হলে,
ঝগড়াদিনের নাম ছিল তার স্বর্ণনলিনী।

মরীচিকা - ওই-যে তোমার মানস-প্রজাপতি

মরীচিকা
- বিচিত্রিতা
-
ওই-যে তোমার মানস-প্রজাপতি
ঘরছাড়া সব ভাবনা যত, অলস দিনে কোথা ওদের
গতি।
দখিন হাওয়ার সাড়া পেয়ে
চঞ্চলতার পতঙ্গদল ভিতর থেকে বাইরে আসে ধেয়ে।
চেলাঞ্চলে উতল হল তারা,
চক্ষে মেলে চপল পাখা আকাশে পথহারা।
বকুলশাখায় পাখির হঠাৎ ডাকে
চমকে-যাওয়া চরণ ঘিরে ঘুরে বেড়ায় শাড়ির
ঘূর্ণিপাকে।
কাটায় ব্যর্থ বেলা
অঙ্গে অঙ্গে অস্থিরতার চকিত এই খেলা।
মনে তোমার ফুল-ফোটানো মায়া
অস্ফুট কোন্ পূর্বরাগের রক্তরঙিন ছায়া।
ঘিরল তারা তোমায় চারি পাশে
ইঙ্গিতে আভাসে
ক্ষণে ক্ষণে চমকে ঝলকে।
তোমার অলকে
দোলা দিয়ে বিনা ভাষায় আলাপ করে কানে কানে,
নাই কোনো যার মানে।
মরীচিকার ফুলের সাথে
মরীচিকার প্রজাপতির মিলন ঘটে ফাল্গুনপ্রভাতে।
আজি তোমার যৌবনেরে ঘেরি
যুগলছায়ার স্বপনখেলা তোমার মধ্যে হেরি।
-
৭ মাঘ, ১৩৩৮

একাকিনী - একাকিনী বসে থাকে আপনারে সাজায়ে যতনে।

একাকিনী
- বিচিত্রিতা
-
একাকিনী বসে থাকে আপনারে সাজায়ে যতনে।
বসনে ভূষণে
যৌবনেরে করে মূল্যবান।
নিজেরে করিবে দান
যার হাতে
সে অজানা তরুণের সাথে
এই যেন দূর হতে তার কথা-বলা।
এই প্রসাধনকলা,
নয়নের এ-কজ্জললেখা,
উজ্জ্বল বসন্তীরঙা অঞ্চলের এ-বঙ্কিমরেখা
মণ্ডিত করেছে দেহ প্রিয়সম্ভাষণে।
দক্ষিণপবনে
অস্পষ্ট উত্তর আসে শিরীষের কম্পিত ছায়ায়।
এইমতো দিন যায়,
ফাগুনের গন্ধে ভরা দিন।
সায়াহ্নিক দিগন্তের সীমন্তে বিলীন
কুঙ্কুম-আভায় আনে
উৎকণ্ঠিত প্রাণে
তুলি' দীর্ঘশ্বাস--
অভাবিত মিলনের আরক্ত আভাস।
-
২৮ ফাল্গুন, ১৩৩৮

হার - শুক্লা একাদশী।

হার
- বিচিত্রিতা
-
শুক্লা একাদশী।
লাজুক রাতের ওড়না পড়ে খসি
বটের ছায়াতলে,
নদীর কালো জলে।
দিনের বেলায় কৃপণ কুসুম কুণ্ঠাভরে
যে-গন্ধ তার লুকিয়ে রাখে নিরুদ্ধ অন্তরে
আজ রাতে তার সকল বাধা ঘোচে,
আপন বাণী নিঃশেষিয়া দেয় সে অসংকোচে।
অনিদ্র কোকিল
দূর শাখাতে মুহুর্মুহু খুঁজতে পাঠায় কুহুগানের মিল।
যেন রে আর সময় তাহার নাই,
এক রাতে আজ এই জীবনের শেষ কথাটি চাই।
ভেবেছিলেম সইবে না আজ লুকিয়ে রাখা
বদ্ধ বাণীর অস্ফুটতায় যে-কথা মোর অর্ধাবরণ-
ঢাকা।
     ভেবেছিলেম বন্দীরে আজ মুক্ত করা সহজ হবে,
ক্ষুদ্র বাধায় দিনে দিনে রুদ্ধ যাহা ছিল
অগৌরবে।
     সে যবে আজ এল ঘরে
জোৎস্নারেখা পড়েছে মোর 'পরে
শিরীষ-ডালের ফাঁকে ফাঁকে।
ভেবেছিলেম বলি তাকে--
"দেখো আমায়, জানো আমায়,
সত্য ডাকে আমায় ডেকে লহো,
সবার চেয়ে গভীর যাহা নিবিড় ভাষায় সেই
কথাটি কহো।
হয় নি মোদের চরম মন্ত্র পড়া,
হয় নি পূর্ণ অভিষেকের তীর্থজলের ঘড়া,
আজ হয়ে যাক মালাবদল যে-মালাটি
অসীম রাত্রিদিন
                          রইবে অমলিন।'
হঠাৎ বলে উঠল সে-যে, ক্রুদ্ধ নয়ন তার--
গড়ের মাঠে তাদের দলের হার হয়েছে,
অন্যায় সেই হার।
বারে বারে ফিরে ফিরে খেলাহারের
গ্লানি
জানিয়ে দিল ক্লান্তি নাহি মানি।
বাতায়নের সমুখ থেকে চাঁদের আলো
নেমে গেল নীচে,
        তখনো সেই নিদ্রাবিহীন কোকিল কুহরিছে।
-
৩ মাঘ, ১৩৩৮

স্যাকরা - কার লাগি এই গয়না গড়াও যতন-ভরে।

স্যাকরা
- বিচিত্রিতা
-
কার লাগি এই গয়না গড়াও
যতন-ভরে।
স্যাকরা বলে, একা আমার
প্রিয়ার তরে।
শুধাই তারে, প্রিয়া তোমার
কোথায় আছে।
স্যাকরা বলে, মনের ভিতর
বুকের কাছে।
আমি বলি, কিনে তো লয়
মহারাজাই।
স্যাকরা বলে, প্রেয়সীরে
আগে সাজাই।
আমি শুধাই, সোনা তোমার
ছোঁয় কবে সে।
স্যাকরা বলে অলখ ছোঁওয়ায়
রূপ লভে সে।
শুধাই, একি একলা তারি
চরণতলে।
স্যাকরা বলে, তারে দিলেই
পায় সকলে।
-
১৩ জ্যৈষ্ঠ, ১৩৩৪

অনাগতা - এসেছিল বহু আগে যারা মোর দ্বারে,

অনাগতা
- বিচিত্রিতা
-
এসেছিল বহু আগে যারা মোর দ্বারে,
যারা চলে গেছে একেবারে,
ফাগুন-মধ্যাহ্নবেলা শিরীষছায়ায় চুপে চুপে
তারা ছায়ারূপে
আসে যায় হিল্লোলিত শ্যাম দুর্বাদলে।
ঘন কালো দিঘিজলে
পিছনে-ফিরিয়া-চাওয়া আঁখি জ্বলো জ্বলো
করে ছলোছলো।
মরণের অমরতালোকে
ধূসর আঁচল মেলি ফিরে তারা গেরুয়া আলোকে।
যে এখনো আসে নাই মোর পথে,
কখনো যে আসিবে না আমার জগতে,
তার ছবি আঁকিয়াছি মনে--
একেলা সে বাতায়নে
বিদেশিনী জন্মকাল হতে।
সে যেন শেঁউলি ভাসে ক্ষীণ মৃদু স্রোতে,
কোথায় তাহার দেশ
নাই সে উদ্দেশ।
চেয়ে আছে দূর-পানে
কার লাগি আপনি সে নাহি জানে।
সেই দূরে ছায়ারূপে রয়েছে সে
বিশ্বের সকল-শেষে
যে আসিতে পারিত তবুও
এল না কভুও।
জীবনের মরীচিকাদেশে
মরুকন্যাটির আঁখি ফিরে ভেসে ভেসে।

শ্যামলা - যে-ধরণী ভালোবাসিয়াছি

শ্যামলা
- বিচিত্রিতা
-
যে-ধরণী ভালোবাসিয়াছি
তোমারে দেখিয়া ভাবি তুমি তারি আছ কাছাকাছি।
হৃদয়ের বিস্তীর্ণ আকাশে
উন্মুক্ত বাতাসে
চিত্ত তব স্নিগ্ধ সুগভীর।
হে শ্যামলা, তুমি ধীর,
সেবা তব সহজ সুন্দর,
কর্মেরে বেষ্টিয়া তব আত্মসমাহিত অবসর।
মাটির অন্তরে
স্তরে স্তরে
রবিরশ্মি নামে পথ করি,
তারি পরিচয় ফুটে দিবসশর্বরী
তরুলতিকায় ঘাসে,
জীবনের বিচিত্র বিকাশে।
তেমনি প্রচ্ছন্ন তেজ চিত্ততলে তব
তোমার বিচিত্র চেষ্টা করে নব নব
প্রাণমূর্তিময়,
দেয় তারে যৌবন অক্ষয়।
প্রতিদিবসের সব কাজে
সৃষ্টির প্রতিভা তব অক্লান্ত বিরাজে।
তাই দেখি তোমার সংসার
চিত্তের সজীব স্পর্শে সর্বত্র তোমার
আপনার।
আষাঢ়ের প্রথম বর্ষণে
মাটির যে-গন্ধ উঠে সিক্ত সমীরণে,
ভাদ্রে যে-নদীটি ভরা কূলে কূলে,
মাঘের শেষে যে-শাখা গন্ধঘন আমের
মুকুলে,
ধানের হিল্লোলে ভরা নবীন যে-খেত,
অশ্বত্থের কম্পিত সংকেত,
আশ্বিনে শিউলিতলে পূজাগন্ধ যে স্নিগ্ধ
ছায়ার,
জানি না এদের সাথে কী মিল
তোমার।
               দেখি ব'সে জানালার ধারে--
প্রান্তরের পারে
নীলাভ নিবিড় বনে
শীতসমীরণে
চঞ্চল পল্লবঘন সবুজের 'পরে
ঝিলিমিলি করে
জনহীন মধ্যাহ্নের সূর্যের কিরণ,
তন্দ্রাবিষ্ট আকাশের স্বপ্নের
মতন।
দিগন্তে মন্থর মেঘ, শঙ্খচিল উড়ে যায় চলি
ঊর্ধ্বশূন্যে, কতমতো পাখির কাকলি,
পীতবর্ণ ঘাস
শুষ্ক মাঠে, ধরণীর বনগন্ধি আতপ্ত
নিঃশ্বাস
মৃদুমন্দ লাগে গায়ে, তখন সে-ক্ষণে
অস্তিত্বের যে ঘনিষ্ঠ অনুভূতি ভরি উঠে
মনে,
প্রাণের যে প্রশান্ত পূর্ণতা, লভি তাই
যখন তোমার কাছে যাই--
যখন তোমারে হেরি
রহিয়াছ আপনারে ঘেরি
গম্ভীর শান্তিতে,
স্নিগ্ধ সুনিস্তব্ধ চিতে,
চক্ষে তব অন্তর্যামী দেবতার উদার প্রসাদ
সৌম্য আশীর্বাদ।
-
৮ মাঘ, ১৩৩৮

প্রভেদ - তোমাতে আমাতে আছে তো প্রভেদ জানি তা বন্ধু,

প্রভেদ
- বিচিত্রিতা
-
তোমাতে আমাতে আছে তো প্রভেদ
জানি তা বন্ধু, জানি,
বিচ্ছেদ তবু অন্তরে নাহি মানি।
এক জ্যোৎস্নায় জেগেছি দুজনে
সারারাত-জাগা পাখির কূজনে,
একই বসন্তে দোঁহাকার মনে
দিয়েছে আপন বাণী।
তুমি চেয়ে আছ আলোকের পানে,
পশ্চাতে মোর মুখ--
অন্তরে তবু গোপন মিলনসুখ।
প্রবল প্রবাহে যৌবনবান
ভাসায়েছে দুটি দোলায়িত প্রাণ,
নিমেষে দোঁহারে করেছে সমান
একই আবর্তে টানি।
সোনার বর্ণ মহিমা তোমার
বিশ্বের মনোহর,
আমি অবনত পাণ্ডুর কলেবর।
উদাস বাতাসে পরান কাঁপায়ে
অগৌরবের শরম ছাপায়ে
আমারে তোমার বসাইল বাঁয়ে,
একাসনে দিল আনি।
নবারুণরাগে রাঙা হয়ে গেল
কালো ভেদরেখাখানি।
-
শ্রীপঞ্চমী, ১৩৩৮

বিদায় - তোমার আমার মাঝে হাজার বৎসর নেমে এল,

বিদায়
- বিচিত্রিতা
-
তোমার আমার মাঝে হাজার বৎসর
নেমে এল, মুহূর্তেই হল যুগান্তর।
মাথায় ঘোমটা টানি
যখনি ফিরালে মুখখানি
কোনো কথা নাহি বলি,
তখনি অতীতে গেলে চলি--
যে-অতীতে অসীম বিরহে
ছায়াসম রহে
বর্তমানে যারা
হয়েছে প্রেমের পথহারা।
যে-পারে গিয়েছ হোথা
বেশি দূর নহে এখনো তা।
ছোটো নির্ঝরিণী শুধু বহে মাঝখানে,
বিদায়ের পদধ্বনি গাঁথে সে করুণ কলগানে।
চেয়ে দেখি অনিমিখে
তুমি চলিয়াছ কোন্ শিখরের দিকে;
যেন স্বপ্নে উঠিতেছ ঊর্ধ্ব-পানে,
যেন তুমি বীণাধ্বনি, শান্ত সুরে তানে
চলিয়াছ মেঘলোকে।
আজি মোর চোখে
কাছের মূর্তির চেয়ে দূরের মূর্তিতে তুমি
বড়ো
অনেক দিনের মোর সব চিন্তা করিয়াছি জড়ো,
সব স্মৃতি,
অব্যক্ত সকল প্রীতি, ব্যক্ত সব গীতি--
উৎসর্গ করিনু আজি, যাত্রী তুমি, তোমার উদ্দেশে।
স্পর্শ যদি নাই করো যাক তবে ভেসে।
-
২৮ জুলাই, ১৯৩২

কন্যাবিদায় - জননী, কন্যারে আজ বিদায়ের ক্ষণে

কন্যাবিদায়
- বিচিত্রিতা
-
জননী, কন্যারে আজ বিদায়ের ক্ষণে
আপন অতীতরূপ পড়িয়াছে মনে
যখন বালিকা ছিলে।
মাতৃক্রোড় হতে
তোমারে ভাসালো ভাগ্য দূরতর
স্রোতে সংসারের।
          তার পর গেল কত দিন
দুঃখে সুখে,
বিচ্ছেদের ক্ষত হল ক্ষীণ।
এ-জন্মের আরম্ভভূমিকা-- সংকীর্ণ সে
প্রথম উষার মতো-- ক্ষণিক প্রদোষে
মিলাইল লয়ে তার স্বর্ণ কুহেলিকা।
বাল্যে পরেছিলে শুভ্র মাঙ্গল্যের টিকা,
সিন্দূররেখায় হল লীন।
সে-রেখাটি
জীবনের পূর্বভাগ দিল যেন কাটি।
আজ সেই ছিন্নখণ্ড ফিরে এল শেষে
তোমার কন্যার মাঝে অশ্রুর আবেশে।

Tuesday, February 23, 2016

দ্বিধা - বাহিরে যার বেশভূষার ছিল না প্রয়োজন,

- দ্বিধা
- বিচিত্রিতা
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
-
বাহিরে যার বেশভূষার ছিল না প্রয়োজন,
হৃদয়তলে আছিল যার বাস,
পরের দ্বারে পাঠাতে তারে দ্বিধায় ভরে মন
কিছুতে হায় পায় না আশ্বাস।
সবুজ বনে নীল গগনে
মিশায় রূপ সবার সনে,
পাখির গানে পরায় যারে সাজ,
ছিন্ন হয়ে সে-ফুল একা
আকাশ-হারা দিবে কি দেখা
পাথরে-গাঁথা প্রাচীর-মাঝে আজ।
চন্দনের গন্ধজলে মুছালো মুখখানি,
নয়নপাতে কাজল দিল আঁকি।
ওষ্ঠাধরে যতনে দিল রক্তরেখা টানি,
কবরী দিল করবীমালে ঢাকি।
ভূষণ যত পরালো দেহে
তাহারি সাথে ব্যাকুল স্নেহে
মিলিল দ্বিধা, মিলিল কত ভয়।
প্রাণে যে ছিল সুপরিচিত
তাহারে নিয়ে ব্যাকুল চিত
রচনা করে চোখের পরিচয়।
-
১৩ মাঘ, ১৩৩৮

Tuesday, February 16, 2016

কালো ঘোড়া - কালো অশ্ব অন্তরে যে সারারাত্রি ফেলেছে নিশ্বাস

কালো ঘোড়া
- বিচিত্রিতা
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
-
কালো অশ্ব অন্তরে যে সারারাত্রি
ফেলেছে নিশ্বাস
          সে আমার অন্ধ অভিলাষ।
অসাধ্যের সাধনায় ছুটে যাবে ব'লে
দুর্গমেরে দ্রুত পায়ে দ'লে
খুরে খুরে খুঁড়েছে ধরণী,
করেছে অধীর হ্রেষাধ্বনি।
ও যেন রে যুগান্তের কালো অগ্নিশিখা,
কালো কুজ্ঝটিকা।
অকস্মাৎ নৈরাশ্য-আঘাতে
দ্বার মুক্ত পেয়ে রাতে
দুর্দাম এসেছে বাহিরিয়া।
যারে নিয়ে এল সে-যে ব্যথায়
মূর্তিত মোর প্রিয়া,
বাহিরে না স্থান পেয়ে
ধ্যানের আসন ছিল ছেয়ে।
এ-অমাবস্যায়
বল্গাহারা কালো অশ্ব ঊর্ধ্বশ্বাসে ধায়।
কালো চিন্তা মম
আত্মঘাতী ঝঞ্ঝাসম
বিস্মৃতির চিরবিলুপ্তিতে
চলে ঝাঁপ দিতে
নিরঙ্কিত পথ বেয়ে।
যাক ধেয়ে।
সৃষ্টিহীন দৃষ্টিহীন রাত্রিপারে
ব্যর্থ দুরাশারে
নিয়ে যাক্--
অন্তিম শূন্যের মাঝে নিশ্চল নির্বাক্।
তার পরে বিরহের অগ্নিস্নানে শুভ্র মন
রৌদ্রস্নাত আশ্বিনের বৃষ্টিশূন্য মেঘের
মতন
উন্মুক্ত আলোকে
দীপ্তি পাক্ সুনির্মল শোকে।
-
৪ মাঘ, ১৩৩৮

Sunday, February 14, 2016

নীহারিকা - বাদল-শেষের আবেশ আছে ছুঁয়ে তমালছায়াতলে,

নীহারিকা
- বিচিত্রিতা
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
-
বাদল-শেষের আবেশ আছে ছুঁয়ে
তমালছায়াতলে,
সজনে গাছের ডাল পড়েছে নুয়ে
দিঘির প্রান্তজলে।
অস্তরবির-পথ-তাকানো মেঘে
কালোর বুকে আলোর বেদন লেগে--
কেন এমন খনে
কে যেন সে উঠল হঠাৎ জেগে
আমার শূন্য মনে।
"কে গো তুমি, ওগো ছায়ায় লীন"
প্রশ্ন পুছিলাম।
সে কহিল, "ছিল এমন দিন
জেনেছ মোর নাম।
নীরব রাতে নিসুত দ্বিপ্রহরে
প্রদীপ তোমার জ্বেলে দিলেম ঘরে,
চোখে দিলেম চুমো;
সেদিন আমায় দেখলে আলস-ভরে
আধ-জাগা আধ-ঘুমো।
আমি তোমার খেয়ালস্রোতে তরী,
প্রথম-দেওয়া খেয়া--
মাতিয়েছিলেম শ্রাবণশর্বরী
লুকিয়ে-ফোটা কেয়া।
সেদিন তুমি নাও নি আমায় বুঝে,
জেগে উঠে পাও নি ভাষা খুঁজে,
দাও নি আসন পাতি--
সংশয়িত স্বপন-সাথে যুঝে
কাটল তোমার রাতি।
তার পরে কোন্ সব-ভুলিবার দিনে
নাম হল মোর হারা!
আমি যেন অকালে আশ্বিনে
এক-পসলার ধারা।
তার পরে তো হল আমার জয়--
সেই প্রদোষের ঝাপসা পরিচয়
ভরল তোমার ভাষা,
তার পরে তো তোমার ছন্দোময়
বেঁধেছি মোর বাসা।
চেনো কিম্বা নাই বা আমায় চেনো
তবু তোমার আমি।
সেই সেদিনের পায়ের ধ্বনি জেনো
আর যাবে না থামি।
যে-আমারে হারালে সেই কবে
তারই সাধন করে গানের রবে
তোমার বীণাখানি।
তোমার বনে প্রোল্লোল পল্লবে
তাহার কানাকানি।
সেদিন আমি এসেছিলেম একা
তোমার আঙিনাতে।
দুয়ার ছিল পাথর দিয়ে ঠেকা
নিদ্রাঘেরা রাতে।
যাবার বেলা সে-দ্বার গেছি খুলে
গন্ধ-বিভোল পবন-বিলোল ফুলে,
রঙ-ছড়ানো বনে--
চঞ্চলিত কত শিথিল চুলে,
কত চোখের কোণে।
রইল তোমার সকল গানের সাথে
ভোলা নামের ধুয়া।
রেখে গেলেম সকল প্রিয়হাতে
এক নিমেষের ছুঁয়া।
মোর বিরহ সব মিলনের তলে
রইল গোপন স্বপন-অশ্রুজলে--
মোর আঁচলের হাওয়া
আজ রাতে ওই কাহার নীলাঞ্চলে
উদাস হয়ে ধাওয়া।"
-
বরানগর , ১ এপ্রিল, ১৯৩১

Friday, February 12, 2016

বেসুর - ভাগ্য তাহার ভুল করেছে --

বেসুর
- বিচিত্রিতা
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
-
ভাগ্য তাহার ভুল করেছে--
প্রাণের তানপুরার
গানের সাথে মিল হল না,
বেসুরো ঝংকার।
এমন ত্রুটি ঘটল কিসে
আপনিও তা বোঝে নি সে,
অভাব কোথাও নেই-যে কিছুই
এই কি অভাব তার।
ঘরটাকে তার ছাড়িয়ে গেল
ঘরেরই আসবাবে।
মনটাকে তার ঠাঁই দিল না ধনের প্রাদুর্ভাবে।
যা চাই তারো অনেক বেশি
ভিড় করে রয় ঘেঁষাষেঁষি,
সেই ব্যাঘাতের বিরুদ্ধে তাই
বিদ্রোহ তার নাবে।
সব চেয়ে যা সহজ সেটাই দুর্লভ তার কাছে।
সেই সহজের মূর্তি যে তার বুকের মধ্যে আছে।
সেই সহজের খেলাঘরে
ওই যারা সব মেলা করে
দূর হতে ওর বদ্ধ জীবন সঙ্গ তাদের যাচে।
প্রাণের নিঝর স্বভাব-ধারায় বয় সকলের পানে,
সেটাই কি কেউ ফিরিয়ে দিল উলটো দিকের টানে।
আত্মদানের রুদ্ধ বাণী
বক্ষকপাট বেড়ায় হানি,
সঞ্চিত তার সুধা কি তাই ব্যথা জাগায় প্রাণে।
আপনি যেন আর কেহ সে এই লাগে তার মনে,
চেনা ঘরের অচল ভিতে কাটায় নির্বাসনে।
বসন ভূষণ অঙ্গরাগে
ছদ্মবেশের মতন লাগে,
তার আপনার ভাষা যে হায় কয় না আপন জনে।
আজকে তারে নিজের কাছে পর করেছে কা'রা,
আপন-মাঝে বিদেশে বাস হায় এ কেমনধারা।
পরের খুশি দিয়ে সে যে
তৈরি হল ঘ'ষে মেজে,
আপনাকে তাই খুঁজে বেড়ায়
নিত্য আপন-হারা।
-
খড়দা, ২ মাঘ, ১৩৩৮

Thursday, February 11, 2016

যুগল - আমি থাকি একা, এই বাতায়নে বসে

""যুগল""
- বিচিত্রিতা
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
-
আমি থাকি একা,
এই বাতায়নে বসে এক বৃন্তে যুগলকে দেখা--
সেই মোর সার্থকতা।
বুঝিতে পারি সে কথা
লোকে লোকে কী আগ্রহ অহরহ
করিছে সন্ধান
আপনার বাহিরেতে কোথা হবে আপনার দান।
তা নিয়ে বিপুল দুঃখে বিশ্বচিত্ত জেগে উঠে,
তারি সুখে পূর্ণ হয়ে ফুটে
যা-কিছু মধুর।
যত বাণী, যত সুর,
যত রূপ, তপস্যার যত বহ্নিলিখা,
সৃষ্টিচিত্তশিখা,
আকাশে আকাশে লিখে
দিকে দিকে
অণুপরমাণুদের মিলনের ছবি।
গ্রহ তারা রবি
যে-আগুন জ্বেলেছে তা বাসনারই দাহ,
সেই তাপে জগৎপ্রবাহ
চঞ্চলিয়া চলিয়াছে বিরহমিলনদ্বন্দ্বঘাতে।
দিনরাতে
কালের অতীত পার হতে,
অনাদি আহ্বানধ্বনি ফিরিতেছে ছায়াতে আলোতে।
সেই ডাক শুনে
কত সাজে সাজিয়েছে আজি এ-ফাল্গুনে
বনে বনে অভিসারিকার দল,
পত্রে পুষ্পে হয়েছে চঞ্চল--
সমস্ত বিশ্বের মর্মে যে-চাঞ্চল্য তারায় তারায়
তরঙ্গিছে প্রকাশধারায়,
নিখিল ভুবনে নিত্য যে-সংগীত বাজে
মূর্তি নিল বনচ্ছায়ে যুগলের সাজে।

Tuesday, February 9, 2016

ভীরু - এ কম্পিত প্রেম, অয়ি ভীরু, এনেছ সংসারে --

"""ভীরু"""
- বিচিত্রিতা
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
-
এ কম্পিত প্রেম, অয়ি ভীরু, এনেছ সংসারে--
ব্যর্থ করি রাখিবে কি তারে।
আলোকশঙ্কিত তব হিয়া
প্রচ্ছন্ন নিভৃত পথ দিয়া
থেমে যায় প্রাঙ্গণের দ্বারে।
হায়, সে যে পায় নাই আপন নিশ্চিত পরিচয়,
বন্দী তারে রেখেছে সংশয়।
বাহিরে সামান্য বাধা সেও
সে-প্রেমেরে কেন করে হেয়,
অন্তরেও তার পরাজয়।
ওই শোনো কেঁপে ওঠে নিশীথরাত্রির অন্ধকার,
আহ্বান আসিছে বারম্বার।
থেকো না ভয়ের অন্ধ ঘেরে,
অবজ্ঞা করিয়ো দুর্গমেরে,
জিনি লহো সত্যেরে তোমার।
নিষ্ঠুরকে মেনে লহো সুদুঃসহ দুঃখের উৎসাহে,
প্রেমের গৌরব জেনো তাহে।
দীপ্তি দেয় রুদ্ধ অশ্রুজল,
নষ্ট আশা হয় না নিষ্ফল,
সমুজ্জল করে চিত্তদাহে।
শীর্ণ ফুল রৌদ্রে পুড়ে কালো হয়, হোক-না সে
কালো--
                      দীন দীপে নিবুক-না আলো।
দুর্বল যে মিথ্যার খাঁচায়
নিত্যকাল কে তারে বাঁচায়,
মরে যাহা মরা তার ভালো।
আঘাত বাঁচাতে গিয়ে বঞ্চিত হবে কি এ-জীবন,
শুধিবে না দুর্মূল্যের পণ।
প্রেম সে কি কৃপণতা জানে,
আত্মরক্ষা করে আত্মদানে--
ত্যাগবীর্যে লভে মুক্তিধন।
-
১০ মাঘ, ১৩৩৮

Monday, February 8, 2016

পুষ্পচয়িনী - হে পুষ্পচয়িনী,

পুষ্পচয়িনী
- বিচিত্রিতা
-
হে পুষ্পচয়িনী,
ছেড়ে আসিয়াছ তুমি কবে উজ্জয়িনী
মালিনীছন্দের বন্ধ টুটে।
বকুল উৎফুল্ল হয়ে উঠে
আজো বুঝি তব মুখমদে।
নূপুররণিত পদে।
আজো বুঝি অশোকের ভাঙাইবে ঘুম।
কী সেই কুসুম
যা দিয়ে অতীত জন্মে গণেছিলে বিরহের দিন।
বুঝি সে-ফুলের নাম বিস্মৃতিবিলীন
ভর্তৃপ্রসাদন ব্রতে যা দিয়ে গাঁথিতে মালা
সাজাইতে বরণের ডালা।
মনে হয় যেন তুমি ভুলে-যাওয়া তুমি--
মর্ত্যভূমি
তোমারে যা ব'লে জানে সেই পরিচয়
সম্পূর্ণ তো নয়।
তুমি আজ
করেছ যে-অঙ্গসাজ
নহে সদ্য আজিকার।
কালোয় রাঙায় তার
যে ভঙ্গীটি পেয়েছে প্রকাশ
দেয় বহুদূরের আভাস।
মনে হয় যেন অজানিতে
রয়েছ অতীতে।
মনে হয় যে-প্রিয়ের লাগি
অবন্তীনগরসৌধে ছিলে জাগি,
তাহারি উদ্দেশে
না জেনে সেজেছ বুঝি সে-যুগের বেশে।
মালতীশাখার 'পরে
এই-যে তুলেছ হাত ভঙ্গীভরে
নহে ফুল তুলিবার প্রয়োজনে,
বুঝি আছে মনে
যুগ-অন্তরাল হতে বিস্মৃত বল্লভ
লুকায়ে দেখিছে তব সুকোমল ও-করপল্লব।
অশরীরী মুগ্ধনেত্র যেন গগনে সে
হেরে অনিমেষে
দেহভঙ্গিমার মিল লতিকার সাথে
আজি মাঘীপূর্ণিমার রাতে।
বাতাসেতে অলক্ষিতে যেন কার ব্যাপ্ত ভালোবাসা
তোমার যৌবনে দিল নৃত্যময়ী ভাষা।
-
১০ মাঘ, ১৩৩৮

Sunday, February 7, 2016

ছায়াসঙ্গিনী - কোন্ ছায়াখানি সঙ্গে তব ফেরে লয়ে স্বপ্নরুদ্ধ বাণী

ছায়াসঙ্গিনী
- বিচিত্রিতা
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
-
কোন্ ছায়াখানি
সঙ্গে তব ফেরে লয়ে স্বপ্নরুদ্ধ বাণী
তুমি কি আপনি তাহা জানো।
চোখের দৃষ্টিতে তব রয়েছে বিছানো।
আপনাবিস্মৃত তারি।
স্তম্ভিত স্তিমিত অশ্রুবারি।
একদিন জীবনের প্রথম ফাল্গুনী
এসেছিল, তুমি তারি পদধ্বনি শুনি
কম্পিত কৌতুকী
যেমনি খুলিয়া দ্বার দিলে উঁকি
আম্রমঞ্জরির গন্ধে মধুপগুঞ্জনে
হৃদয়স্পন্দনে
এক ছন্দে মিলে গেল বনের মর্মর।
অশোকের কিশলয়স্তর
উৎসুক যৌবনে তব বিস্তারিল নবীন রক্তিমা।
প্রাণোচ্ছ্বাস নাহি পায় সীমা
তোমার আপনা-মাঝে,
সে-প্রাণেরই ছন্দ বাজে
দূর নীল বনান্তের বিহঙ্গসংগীতে,
দিগন্তে নির্জনলীন রাখালের করুণ বংশীতে।
তব বনচ্ছায়ে
আসিল অতিথি পান্থ, তৃণস্তরে দিল সে বিছায়ে
উত্তরী-অংশুকে তার সুবর্ণ পূর্ণিমা
চম্পকবর্ণিমা।
তারি সঙ্গে মিশে
প্রভাতের মৃদু রৌদ্র দিশে দিশে
তোমার বিধুর হিয়া
দিল উচ্ছ্বাসিয়া।
তার পর সসংকোচে বদ্ধ করি দিলে তব দ্বার,
উচ্ছৃঙ্খল সমীরণে উদ্দাম কুন্তলভার
লইলে সংযত করি--
অশান্ত তরুণ প্রেম বসন্তের পন্থ অনুসরি
স্খলিত কিংশুক-সাথে
জীর্ণ হল ধূসর ধুলাতে।
তুমি ভাবো সেই রাত্রিদিন
চিহ্নহীন
মল্লিকাগন্ধের মতো
নির্বিশেষে গত।
জানো না কি যে-বসন্ত সম্বরিল কায়া
তারি মৃত্যুহীন ছায়া
অহর্নিশি আছে তব সাথে সাথে
তোমার অজ্ঞাতে।
অদৃশ্য মঞ্জরি তার আপনার রেণুর রেখায়
মেশে তব সীমন্তের সিন্দূরলেখায়।
সুদূর সে ফাল্গুনের স্তব্ধ সুর
তোমার কণ্ঠের স্বর করি দিল উদাত্ত মধুর।
যে চাঞ্চল্য হয়ে গেছে স্থির
তারি মন্ত্রে চিত্ত তব সকরুণ, শান্ত, সুগম্ভীর।
-
মাঘ, ১৩৩৮