Tuesday, February 9, 2016

রাশিয়ার চিঠি - এই যুগে বিশ্ব-ইতিহাসের রঙ্গভূমির পর্দা উঠে গেছে।

রাশিয়ার চিঠি
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
-
এই যুগে বিশ্ব-ইতিহাসের
রঙ্গভূমির পর্দা উঠে গেছে।
এতকাল যেন আড়ালে আড়ালে
রিহার্স্যাল চলছিল, টুকরো টুকরো
ভাবে, ভিন্ন ভিন্ন কামরায়।
প্রত্যেক দেশের চারি দিকে
বেড়া ছিল। বাহির থেকে
আনাগোনা করবার পথ একেবারে
ছিল না তা নয়, কিন্তু বিভাগের
মধ্যে মানবসংসারের যে
চেহারা দেখেছি আজ তা দেখি
নে। সেদিন দেখা যাচ্ছিল
একটি-একটি গাছ, আজ দেখছি
অরণ্য। মানবসমাজের মধ্যে যদি
ভারসামঞ্জস্যের অভাব ঘটে
থাকে সেটা আজ দেখা দিচ্ছে
পৃথিবীর এক দিক থেকে আর-এক
দিক পর্যন্ত। এমন বিরাট করে
দেখতে পাওয়া কম কথা নয়।
-
(কিছু অংশ)

Monday, February 8, 2016

পুষ্পচয়িনী - হে পুষ্পচয়িনী,

পুষ্পচয়িনী
- বিচিত্রিতা
-
হে পুষ্পচয়িনী,
ছেড়ে আসিয়াছ তুমি কবে উজ্জয়িনী
মালিনীছন্দের বন্ধ টুটে।
বকুল উৎফুল্ল হয়ে উঠে
আজো বুঝি তব মুখমদে।
নূপুররণিত পদে।
আজো বুঝি অশোকের ভাঙাইবে ঘুম।
কী সেই কুসুম
যা দিয়ে অতীত জন্মে গণেছিলে বিরহের দিন।
বুঝি সে-ফুলের নাম বিস্মৃতিবিলীন
ভর্তৃপ্রসাদন ব্রতে যা দিয়ে গাঁথিতে মালা
সাজাইতে বরণের ডালা।
মনে হয় যেন তুমি ভুলে-যাওয়া তুমি--
মর্ত্যভূমি
তোমারে যা ব'লে জানে সেই পরিচয়
সম্পূর্ণ তো নয়।
তুমি আজ
করেছ যে-অঙ্গসাজ
নহে সদ্য আজিকার।
কালোয় রাঙায় তার
যে ভঙ্গীটি পেয়েছে প্রকাশ
দেয় বহুদূরের আভাস।
মনে হয় যেন অজানিতে
রয়েছ অতীতে।
মনে হয় যে-প্রিয়ের লাগি
অবন্তীনগরসৌধে ছিলে জাগি,
তাহারি উদ্দেশে
না জেনে সেজেছ বুঝি সে-যুগের বেশে।
মালতীশাখার 'পরে
এই-যে তুলেছ হাত ভঙ্গীভরে
নহে ফুল তুলিবার প্রয়োজনে,
বুঝি আছে মনে
যুগ-অন্তরাল হতে বিস্মৃত বল্লভ
লুকায়ে দেখিছে তব সুকোমল ও-করপল্লব।
অশরীরী মুগ্ধনেত্র যেন গগনে সে
হেরে অনিমেষে
দেহভঙ্গিমার মিল লতিকার সাথে
আজি মাঘীপূর্ণিমার রাতে।
বাতাসেতে অলক্ষিতে যেন কার ব্যাপ্ত ভালোবাসা
তোমার যৌবনে দিল নৃত্যময়ী ভাষা।
-
১০ মাঘ, ১৩৩৮

Sunday, February 7, 2016

ছায়াসঙ্গিনী - কোন্ ছায়াখানি সঙ্গে তব ফেরে লয়ে স্বপ্নরুদ্ধ বাণী

ছায়াসঙ্গিনী
- বিচিত্রিতা
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
-
কোন্ ছায়াখানি
সঙ্গে তব ফেরে লয়ে স্বপ্নরুদ্ধ বাণী
তুমি কি আপনি তাহা জানো।
চোখের দৃষ্টিতে তব রয়েছে বিছানো।
আপনাবিস্মৃত তারি।
স্তম্ভিত স্তিমিত অশ্রুবারি।
একদিন জীবনের প্রথম ফাল্গুনী
এসেছিল, তুমি তারি পদধ্বনি শুনি
কম্পিত কৌতুকী
যেমনি খুলিয়া দ্বার দিলে উঁকি
আম্রমঞ্জরির গন্ধে মধুপগুঞ্জনে
হৃদয়স্পন্দনে
এক ছন্দে মিলে গেল বনের মর্মর।
অশোকের কিশলয়স্তর
উৎসুক যৌবনে তব বিস্তারিল নবীন রক্তিমা।
প্রাণোচ্ছ্বাস নাহি পায় সীমা
তোমার আপনা-মাঝে,
সে-প্রাণেরই ছন্দ বাজে
দূর নীল বনান্তের বিহঙ্গসংগীতে,
দিগন্তে নির্জনলীন রাখালের করুণ বংশীতে।
তব বনচ্ছায়ে
আসিল অতিথি পান্থ, তৃণস্তরে দিল সে বিছায়ে
উত্তরী-অংশুকে তার সুবর্ণ পূর্ণিমা
চম্পকবর্ণিমা।
তারি সঙ্গে মিশে
প্রভাতের মৃদু রৌদ্র দিশে দিশে
তোমার বিধুর হিয়া
দিল উচ্ছ্বাসিয়া।
তার পর সসংকোচে বদ্ধ করি দিলে তব দ্বার,
উচ্ছৃঙ্খল সমীরণে উদ্দাম কুন্তলভার
লইলে সংযত করি--
অশান্ত তরুণ প্রেম বসন্তের পন্থ অনুসরি
স্খলিত কিংশুক-সাথে
জীর্ণ হল ধূসর ধুলাতে।
তুমি ভাবো সেই রাত্রিদিন
চিহ্নহীন
মল্লিকাগন্ধের মতো
নির্বিশেষে গত।
জানো না কি যে-বসন্ত সম্বরিল কায়া
তারি মৃত্যুহীন ছায়া
অহর্নিশি আছে তব সাথে সাথে
তোমার অজ্ঞাতে।
অদৃশ্য মঞ্জরি তার আপনার রেণুর রেখায়
মেশে তব সীমন্তের সিন্দূরলেখায়।
সুদূর সে ফাল্গুনের স্তব্ধ সুর
তোমার কণ্ঠের স্বর করি দিল উদাত্ত মধুর।
যে চাঞ্চল্য হয়ে গেছে স্থির
তারি মন্ত্রে চিত্ত তব সকরুণ, শান্ত, সুগম্ভীর।
-
মাঘ, ১৩৩৮

Thursday, February 4, 2016

বরবধূ - এ-পারে চলে বর, বধূ সে পরপারে,

বরবধূ
- বিচিত্রিতা
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
-
এ-পারে চলে বর, বধূ সে পরপারে,
সেতুটি বাঁধা তার মাঝে।
তাহারি 'পরে দান আসিছে ভারে ভারে,
তাহারি 'পরে বাঁশি বাজে।
যাত্রা দুজনার
লক্ষ্য একই তার,
তবুও যত কাছে আসে
সতত যেন থাকে
বিরহ ফাঁকে ফাঁকে
তৃপ্তিহারা অবকাশে।
সে-ফাঁক গেলে ঘুচে থেমে যে যাবে গান,
দৃষ্টি হবে বাধাময়,
যেথায় দূর নাহি সেথায় যত দান
কাছেতে ছোটো হয়ে রয়।
বিরহনদীজলে
খেয়ার তরী চলে,
বায় সে মিলনেরই ঘাটে।
হৃদয় বারবার
করিবে পারাপার
মিলিতে উৎসবনাটে।
বেলা যে পড়ে এল, সূর্য নামে ধীরে,
আলোক ম্লান হয়ে আসে।
ভাঙিয়া গেছে হাট, জনতাহীন তীরে
নৌকা বাঁধা পাশে পাশে।
এ-পারে বর চলে
পুরানো বটতলে,
নদীটি বহি চলে মাঝে,
বধূরে দেখা যায়
মাঠের কিনারায়,
সেতুর 'পরে বাঁশি বাজে।

Wednesday, February 3, 2016

প্রকাশিতা - আজ তুমি ছোটো বটে, যার সঙ্গে গাঁঠছড়া বাঁধা যেন তার আধা।

প্রকাশিতা
- বিচিত্রিতা
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
-
আজ তুমি ছোটো বটে,
যার সঙ্গে গাঁঠছড়া বাঁধা
যেন তার আধা।
অধিকারগর্বভরে
সে তোমারে নিয়ে চলে নিজঘরে।
মনে জানে তুমি তার ছায়েবানুগতা--
তমাল সে, তার শাখালগ্ন তুমি মাধবীর লতা।
আজ তুমি রাঙাচেলি দিয়ে মোড়া
আগাগোড়া,
জড়োসড়ো ঘোমটায়-ঢাকা
ছবি যেন পটে আঁকা।
আসিবে-যে আর-একদিন,
নারীর মহিমা নিয়ে হবে তুমি অন্তরে স্বাধীন
বাহিরে যেমনি থাক্।
আজিকে এই-যে বাজে শাঁখ
এরি মধ্যে আছে গূঢ় তব জয়ধ্বনি।
জিনি লবে তোমার সংসার, হে রমণী,
সেবার গৌরবে।
যে-জন আশ্রয় তব তোমারি আশ্রয় সেই লবে।
সংকোচের এই আবরণ দূর ক'রে
সেদিন কহিবে-- দেখো মোরে!
সে দেখিবে ঊর্ধ্বে মুখ তুলি
সৃপ্ত হয়ে পড়ে গেছে ধূসর সে কুণ্ঠিত গোধূলি--
দিগন্তের 'পরে স্মিতহাসে
পূর্ণচন্দ্র একা জাগে বসন্তের বিস্মিত আকাশে।
বুঝিবে সে দেহে মনে।
প্রচ্ছন্ন হয়েছে তরু পুষ্পিত লতার আলিঙ্গনে

Tuesday, February 2, 2016

সাজ - এই-যে রাঙা চেলি দিয়ে তোমায় সাজানো,

সাজ
- বিচিত্রিতা
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
-
এই-যে রাঙা চেলি দিয়ে তোমায় সাজানো,
ওই-যে হোথায় দ্বারের কাছে সানাই বাজানো,
অদৃশ্য এক লিপির লিখায়
নবীন প্রাণের কোন্ ভূমিকায়
মিলছে, না জানো।
শিশুবেলায় ধূলির 'পরে আঁচল এলিয়ে
সাজিয়ে পুতুল কাটল বেলা খেলা খেলিয়ে।
বুঝতে নাহি পারবে আজো
আজ কী খেলায় আপনি সাজো
হৃদয় মেলিয়ে।
অখ্যাত এই প্রাণের কোণে সন্ধ্যাবেলাতে
বিশ্বখেলোয়াড়ের খেয়াল নামল খেলাতে।
দুঃখসুখের তুফান লেগে
পুতুল-ভাসান চলল বেগে
ভাগ্যভেলাতে।
তার পরেতে ভোলার পালা, কথা কবে না--
অসীম কালের পটে ছবির চিহ্ন রবে না।
তার পরেতে জিতবে ধুলো,
ভাঙা খেলার চিহ্নগুলো
সঙ্গে লবে না।
রাঙা রঙের চেলি দিয়ে কন্যে সাজানো,
দ্বারের কাছে বেহাগ রাগে সানাই বাজানো,
এই মানে তার বুঝতে পারি--
খেয়াল যাঁহার খুশি তাঁরি
জানো না-জানো।

আমার স্বপন হল সারা,

আমার স্বপন হল সারা,
এখন প্রাণে বীণা বাজায় ভোরের তারা।
দেবার মতো যা ছিল মোর নাই কিছু আর হাতে,
তোমার আশীর্বাদের মালা নেব কেবল মাথে
আমার ললাট ঘেরি—
আমার আর হবে না দেরি॥