Friday, February 26, 2016

মরীচিকা - ওই-যে তোমার মানস-প্রজাপতি

মরীচিকা
- বিচিত্রিতা
-
ওই-যে তোমার মানস-প্রজাপতি
ঘরছাড়া সব ভাবনা যত, অলস দিনে কোথা ওদের
গতি।
দখিন হাওয়ার সাড়া পেয়ে
চঞ্চলতার পতঙ্গদল ভিতর থেকে বাইরে আসে ধেয়ে।
চেলাঞ্চলে উতল হল তারা,
চক্ষে মেলে চপল পাখা আকাশে পথহারা।
বকুলশাখায় পাখির হঠাৎ ডাকে
চমকে-যাওয়া চরণ ঘিরে ঘুরে বেড়ায় শাড়ির
ঘূর্ণিপাকে।
কাটায় ব্যর্থ বেলা
অঙ্গে অঙ্গে অস্থিরতার চকিত এই খেলা।
মনে তোমার ফুল-ফোটানো মায়া
অস্ফুট কোন্ পূর্বরাগের রক্তরঙিন ছায়া।
ঘিরল তারা তোমায় চারি পাশে
ইঙ্গিতে আভাসে
ক্ষণে ক্ষণে চমকে ঝলকে।
তোমার অলকে
দোলা দিয়ে বিনা ভাষায় আলাপ করে কানে কানে,
নাই কোনো যার মানে।
মরীচিকার ফুলের সাথে
মরীচিকার প্রজাপতির মিলন ঘটে ফাল্গুনপ্রভাতে।
আজি তোমার যৌবনেরে ঘেরি
যুগলছায়ার স্বপনখেলা তোমার মধ্যে হেরি।
-
৭ মাঘ, ১৩৩৮

একাকিনী - একাকিনী বসে থাকে আপনারে সাজায়ে যতনে।

একাকিনী
- বিচিত্রিতা
-
একাকিনী বসে থাকে আপনারে সাজায়ে যতনে।
বসনে ভূষণে
যৌবনেরে করে মূল্যবান।
নিজেরে করিবে দান
যার হাতে
সে অজানা তরুণের সাথে
এই যেন দূর হতে তার কথা-বলা।
এই প্রসাধনকলা,
নয়নের এ-কজ্জললেখা,
উজ্জ্বল বসন্তীরঙা অঞ্চলের এ-বঙ্কিমরেখা
মণ্ডিত করেছে দেহ প্রিয়সম্ভাষণে।
দক্ষিণপবনে
অস্পষ্ট উত্তর আসে শিরীষের কম্পিত ছায়ায়।
এইমতো দিন যায়,
ফাগুনের গন্ধে ভরা দিন।
সায়াহ্নিক দিগন্তের সীমন্তে বিলীন
কুঙ্কুম-আভায় আনে
উৎকণ্ঠিত প্রাণে
তুলি' দীর্ঘশ্বাস--
অভাবিত মিলনের আরক্ত আভাস।
-
২৮ ফাল্গুন, ১৩৩৮

হার - শুক্লা একাদশী।

হার
- বিচিত্রিতা
-
শুক্লা একাদশী।
লাজুক রাতের ওড়না পড়ে খসি
বটের ছায়াতলে,
নদীর কালো জলে।
দিনের বেলায় কৃপণ কুসুম কুণ্ঠাভরে
যে-গন্ধ তার লুকিয়ে রাখে নিরুদ্ধ অন্তরে
আজ রাতে তার সকল বাধা ঘোচে,
আপন বাণী নিঃশেষিয়া দেয় সে অসংকোচে।
অনিদ্র কোকিল
দূর শাখাতে মুহুর্মুহু খুঁজতে পাঠায় কুহুগানের মিল।
যেন রে আর সময় তাহার নাই,
এক রাতে আজ এই জীবনের শেষ কথাটি চাই।
ভেবেছিলেম সইবে না আজ লুকিয়ে রাখা
বদ্ধ বাণীর অস্ফুটতায় যে-কথা মোর অর্ধাবরণ-
ঢাকা।
     ভেবেছিলেম বন্দীরে আজ মুক্ত করা সহজ হবে,
ক্ষুদ্র বাধায় দিনে দিনে রুদ্ধ যাহা ছিল
অগৌরবে।
     সে যবে আজ এল ঘরে
জোৎস্নারেখা পড়েছে মোর 'পরে
শিরীষ-ডালের ফাঁকে ফাঁকে।
ভেবেছিলেম বলি তাকে--
"দেখো আমায়, জানো আমায়,
সত্য ডাকে আমায় ডেকে লহো,
সবার চেয়ে গভীর যাহা নিবিড় ভাষায় সেই
কথাটি কহো।
হয় নি মোদের চরম মন্ত্র পড়া,
হয় নি পূর্ণ অভিষেকের তীর্থজলের ঘড়া,
আজ হয়ে যাক মালাবদল যে-মালাটি
অসীম রাত্রিদিন
                          রইবে অমলিন।'
হঠাৎ বলে উঠল সে-যে, ক্রুদ্ধ নয়ন তার--
গড়ের মাঠে তাদের দলের হার হয়েছে,
অন্যায় সেই হার।
বারে বারে ফিরে ফিরে খেলাহারের
গ্লানি
জানিয়ে দিল ক্লান্তি নাহি মানি।
বাতায়নের সমুখ থেকে চাঁদের আলো
নেমে গেল নীচে,
        তখনো সেই নিদ্রাবিহীন কোকিল কুহরিছে।
-
৩ মাঘ, ১৩৩৮

স্যাকরা - কার লাগি এই গয়না গড়াও যতন-ভরে।

স্যাকরা
- বিচিত্রিতা
-
কার লাগি এই গয়না গড়াও
যতন-ভরে।
স্যাকরা বলে, একা আমার
প্রিয়ার তরে।
শুধাই তারে, প্রিয়া তোমার
কোথায় আছে।
স্যাকরা বলে, মনের ভিতর
বুকের কাছে।
আমি বলি, কিনে তো লয়
মহারাজাই।
স্যাকরা বলে, প্রেয়সীরে
আগে সাজাই।
আমি শুধাই, সোনা তোমার
ছোঁয় কবে সে।
স্যাকরা বলে অলখ ছোঁওয়ায়
রূপ লভে সে।
শুধাই, একি একলা তারি
চরণতলে।
স্যাকরা বলে, তারে দিলেই
পায় সকলে।
-
১৩ জ্যৈষ্ঠ, ১৩৩৪

অনাগতা - এসেছিল বহু আগে যারা মোর দ্বারে,

অনাগতা
- বিচিত্রিতা
-
এসেছিল বহু আগে যারা মোর দ্বারে,
যারা চলে গেছে একেবারে,
ফাগুন-মধ্যাহ্নবেলা শিরীষছায়ায় চুপে চুপে
তারা ছায়ারূপে
আসে যায় হিল্লোলিত শ্যাম দুর্বাদলে।
ঘন কালো দিঘিজলে
পিছনে-ফিরিয়া-চাওয়া আঁখি জ্বলো জ্বলো
করে ছলোছলো।
মরণের অমরতালোকে
ধূসর আঁচল মেলি ফিরে তারা গেরুয়া আলোকে।
যে এখনো আসে নাই মোর পথে,
কখনো যে আসিবে না আমার জগতে,
তার ছবি আঁকিয়াছি মনে--
একেলা সে বাতায়নে
বিদেশিনী জন্মকাল হতে।
সে যেন শেঁউলি ভাসে ক্ষীণ মৃদু স্রোতে,
কোথায় তাহার দেশ
নাই সে উদ্দেশ।
চেয়ে আছে দূর-পানে
কার লাগি আপনি সে নাহি জানে।
সেই দূরে ছায়ারূপে রয়েছে সে
বিশ্বের সকল-শেষে
যে আসিতে পারিত তবুও
এল না কভুও।
জীবনের মরীচিকাদেশে
মরুকন্যাটির আঁখি ফিরে ভেসে ভেসে।

শ্যামলা - যে-ধরণী ভালোবাসিয়াছি

শ্যামলা
- বিচিত্রিতা
-
যে-ধরণী ভালোবাসিয়াছি
তোমারে দেখিয়া ভাবি তুমি তারি আছ কাছাকাছি।
হৃদয়ের বিস্তীর্ণ আকাশে
উন্মুক্ত বাতাসে
চিত্ত তব স্নিগ্ধ সুগভীর।
হে শ্যামলা, তুমি ধীর,
সেবা তব সহজ সুন্দর,
কর্মেরে বেষ্টিয়া তব আত্মসমাহিত অবসর।
মাটির অন্তরে
স্তরে স্তরে
রবিরশ্মি নামে পথ করি,
তারি পরিচয় ফুটে দিবসশর্বরী
তরুলতিকায় ঘাসে,
জীবনের বিচিত্র বিকাশে।
তেমনি প্রচ্ছন্ন তেজ চিত্ততলে তব
তোমার বিচিত্র চেষ্টা করে নব নব
প্রাণমূর্তিময়,
দেয় তারে যৌবন অক্ষয়।
প্রতিদিবসের সব কাজে
সৃষ্টির প্রতিভা তব অক্লান্ত বিরাজে।
তাই দেখি তোমার সংসার
চিত্তের সজীব স্পর্শে সর্বত্র তোমার
আপনার।
আষাঢ়ের প্রথম বর্ষণে
মাটির যে-গন্ধ উঠে সিক্ত সমীরণে,
ভাদ্রে যে-নদীটি ভরা কূলে কূলে,
মাঘের শেষে যে-শাখা গন্ধঘন আমের
মুকুলে,
ধানের হিল্লোলে ভরা নবীন যে-খেত,
অশ্বত্থের কম্পিত সংকেত,
আশ্বিনে শিউলিতলে পূজাগন্ধ যে স্নিগ্ধ
ছায়ার,
জানি না এদের সাথে কী মিল
তোমার।
               দেখি ব'সে জানালার ধারে--
প্রান্তরের পারে
নীলাভ নিবিড় বনে
শীতসমীরণে
চঞ্চল পল্লবঘন সবুজের 'পরে
ঝিলিমিলি করে
জনহীন মধ্যাহ্নের সূর্যের কিরণ,
তন্দ্রাবিষ্ট আকাশের স্বপ্নের
মতন।
দিগন্তে মন্থর মেঘ, শঙ্খচিল উড়ে যায় চলি
ঊর্ধ্বশূন্যে, কতমতো পাখির কাকলি,
পীতবর্ণ ঘাস
শুষ্ক মাঠে, ধরণীর বনগন্ধি আতপ্ত
নিঃশ্বাস
মৃদুমন্দ লাগে গায়ে, তখন সে-ক্ষণে
অস্তিত্বের যে ঘনিষ্ঠ অনুভূতি ভরি উঠে
মনে,
প্রাণের যে প্রশান্ত পূর্ণতা, লভি তাই
যখন তোমার কাছে যাই--
যখন তোমারে হেরি
রহিয়াছ আপনারে ঘেরি
গম্ভীর শান্তিতে,
স্নিগ্ধ সুনিস্তব্ধ চিতে,
চক্ষে তব অন্তর্যামী দেবতার উদার প্রসাদ
সৌম্য আশীর্বাদ।
-
৮ মাঘ, ১৩৩৮

প্রভেদ - তোমাতে আমাতে আছে তো প্রভেদ জানি তা বন্ধু,

প্রভেদ
- বিচিত্রিতা
-
তোমাতে আমাতে আছে তো প্রভেদ
জানি তা বন্ধু, জানি,
বিচ্ছেদ তবু অন্তরে নাহি মানি।
এক জ্যোৎস্নায় জেগেছি দুজনে
সারারাত-জাগা পাখির কূজনে,
একই বসন্তে দোঁহাকার মনে
দিয়েছে আপন বাণী।
তুমি চেয়ে আছ আলোকের পানে,
পশ্চাতে মোর মুখ--
অন্তরে তবু গোপন মিলনসুখ।
প্রবল প্রবাহে যৌবনবান
ভাসায়েছে দুটি দোলায়িত প্রাণ,
নিমেষে দোঁহারে করেছে সমান
একই আবর্তে টানি।
সোনার বর্ণ মহিমা তোমার
বিশ্বের মনোহর,
আমি অবনত পাণ্ডুর কলেবর।
উদাস বাতাসে পরান কাঁপায়ে
অগৌরবের শরম ছাপায়ে
আমারে তোমার বসাইল বাঁয়ে,
একাসনে দিল আনি।
নবারুণরাগে রাঙা হয়ে গেল
কালো ভেদরেখাখানি।
-
শ্রীপঞ্চমী, ১৩৩৮