পথে
- ক্ষণিকা
-
গাঁয়ের পথে চলেছিলেম
অকারণে,
বাতাস বহে বিকালবেলা
বেণুবনে।
ছায়া তখন আলোর ফাঁকে
লতার মতন জড়িয়ে থাকে,
একা একা কোকিল ডাকে
নিজমনে।
আমি কোথায় চলেছিলেম
অকারণে।
জলের ধারে কুটিরখানি
পাতা-ঢাকা,
দ্বারের 'পরে নুয়ে পড়ে
নিম্বশাখা।
ওই যে শুনি মাঝে মাঝে
না জানি কোন্ নিত্যকাজে
কোথায় দুটি কাঁকন বাজে
গৃহকোণে।
যেতে যেতে এলেম হেথা
অকারণে।
দিঘির জলে ঝলক ঝলে
মানিক হীরা,
সর্ষেখেতে উঠছে মেতে
মৌমাছিরা।
এ পথ গেছে কত গাঁয়ে
কত গাছের ছায়ে ছায়ে
কত মাঠের গায়ে গায়ে
কত বনে।
আমি শুধু হেথায় এলেম
অকারণে।
আরেক দিন সে ফাগুন মাসে
বহু আগে
চলেছিলেম এই পথে সেই
মনে জাগে।
আমের বোলের গন্ধে অবশ
বাতাস ছিল উদাস অলস,
ঘাটের শানে বাজছে কলস
ক্ষণে ক্ষণে।
সে-সব কথা ভাবছি বসে
অকারণে।
দীর্ঘ হয়ে পড়ছে পথে
বাঁকা ছায়া,
গোষ্ঠঘরে ফিরছে ধেনু
শ্রান্তকায়া।
গোধূলিতে খেতের 'পরে
ধূসর আলো ধূ ধূ করে,
বসে আছে খেয়ার তরে
পান্থজনে।
আবার ধীরে চলছি ফিরে
অকারণে।
Sunday, May 1, 2016
পথে - গাঁয়ের পথে চলেছিলেম অকারণে, বাতাস বহে বিকালবেলা বেণুবনে।
প্রতিজ্ঞা - আমি হব না তাপস, হব না, হব না, যেমনি বলুন যিনি।
প্রতিজ্ঞা
- ক্ষণিকা
-
আমি হব না তাপস, হব না, হব না,
যেমনি বলুন যিনি।
আমি হব না তাপস নিশ্চয় যদি
না মেলে তপস্বিনী।
আমি করেছি কঠিন পণ
যদি না মিলে বকুলবন,
যদি মনের মতন মন
না পাই জিনি,
তবে হব না তাপস, হব না, যদি না
পাই সে তপস্বিনী।
আমি ত্যজিব না ঘর, হব না বাহির
উদাসীন সন্ন্যাসী,
যদি ঘরের বাহিরে না হাসে কেহই
ভুবন-ভুলানো হাসি।
যদি না উড়ে নীলাঞ্চল
মধুর বাতাসে বিচঞ্চল,
যদি না বাজে কাঁকন মল
রিনিক-ঝিনি--
আমি হব না তাপস, হব না, যদি না
পাই গো তপস্বিনী।
আমি হব না তাপস, তোমার শপথ,
যদি সে তপের বলে
কোনো নূতন ভুবন না পারি গড়িতে
নূতন হৃদয়-তলে।
যদি জাগায়ে বীণার তার
কারো টুটিয়া মরম-দ্বার,
কোনো নূতন আঁখির ঠার
না লই চিনি
আমি হব না তাপস, হব না, হব না,
না পেলে তপস্বিনী।
সেকাল - আমি যদি জন্ম নিতেম কালিদাসের কালে,
সেকাল
- ক্ষণিকা
-
আমি যদি জন্ম নিতেম
কালিদাসের কালে,
দৈবে হতেম দশম রত্ন
নবরত্নের মালে,
একটি শ্লোকে স্তুতি গেয়ে
রাজার কাছে নিতাম চেয়ে
উজ্জয়িনীর বিজন প্রান্তে
কানন-ঘেরা বাড়ি।
রেবার তটে চাঁপার তলে
সভা বসত সন্ধ্যা হলে,
ক্রীড়াশৈলে আপন-মনে
দিতাম কণ্ঠ ছাড়ি।
জীবনতরী বহে যেত
মন্দাক্রান্তা তালে,
আমি যদি জন্ম নিতাম
কালিদাসের কালে।
ক্ষতিপূরণ - তোমার তরে সবাই মোরে করছে দোষী হে প্রেয়সী !
ক্ষতিপূরণ
- ক্ষণিকা
-
তোমার তরে সবাই মোরে
করছে দোষী
হে প্রেয়সী!
বলছে--কবি তোমার ছবি
আঁকছে গানে,
প্রণয়গীতি গাচ্ছে নিতি
তোমার কানে,
নেশায় মেতে ছন্দে গেঁথে
তুচ্ছ কথা
ঢাকছে শেষে বাংলাদেশে
উচ্চ কথা।
তোমার তরে সবাই মোরে
করছে দোষী
হে প্রেয়সী!
সে কলঙ্ক নিন্দাপঙ্ক
তিলক টানি
এলেম রানী!
ফেলুক মুছি হাস্যশুচি
তোমার লোচন
বিশ্বসুদ্ধ যতেক ক্রুদ্ধ
সমালোচন।
অনুরক্ত তব ভক্ত
নিন্দিতেরে
করো রক্ষে শীতল বক্ষে
বাহুর ঘেরে।
তাই কলঙ্ক নিন্দাপঙ্ক
তিলক টানি
এলেম রানী।
আমি নাবব মহাকাব্য-
সংরচনে
ছিল মনে--
ঠেকল যখন তোমার কাঁকন-
কিংকিণীতে,
কল্পনাটি গেল ফাটি
হাজার গীতে।
মহাকাব্য সেই অভাব্য
দুর্ঘটনায়
পায়ের কাছে ছড়িয়ে আছে
কণায় কণায়।
আমি নাবব মহাকাব্য-
সংরচনে
ছিল মনে।
হায় রে কোথা যুদ্ধকথা
হৈল গত
স্বপ্নমত!
পুরাণচিত্র বীরচরিত্র
অষ্ট সর্গ
কৈল খণ্ড তোমার চণ্ড
নয়ন-খড়্গ।
রইল মাত্র দিবারাত্র
প্রেমের প্রলাপ,
দিলেম ফেলে ভাবীকেলে
কীর্তিকলাপ।
হায় রে কোথা যুদ্ধকথা
হৈল গত
স্বপ্নমত!
সেসব-ক্ষতি-পূরণ প্রতি
দৃষ্টি রাখি
হরিণ-আঁখি!
লোকের মনে সিংহাসনে
নাইকো দাবি--
তোমার মনোগৃহের কোনো
দাও তো চাবি।
মরার পরে চাই নে ওরে
অমর হতে,
অমর হব আঁখির তব
সুধার স্রোতে।
খ্যাতির ক্ষতি-পূরণ প্রতি
দৃষ্টি রাখি
হরিণ-আঁখি!
পরামর্শ - সূর্য গেল অস্তপারে-- লাগল গ্রামের ঘাটে আমার জীর্ণ তরী।
পরামর্শ
- ক্ষণিকা
-
সূর্য গেল অস্তপারে--
লাগল গ্রামের ঘাটে
আমার জীর্ণ তরী।
শেষ বসন্তের সন্ধ্যা-হাওয়া
শস্যশূন্য মাঠে
উঠল হাহা করি।
আর কি হবে নূতন যাত্রা
নূতন রাণীর দেশে
নূতন সাজে সেজে?
এবার যদি বাতাস উঠে
তুফান জাগে শেষে,
ফিরে আসবি নে যে।
অনেক বার তো হাল ভেঙেছে,
পাল গিয়েছে ছিঁড়ে
ওরে দুঃসাহসী।
সিন্ধুপানে গেছিস ভেসে
অকূল কালো নীরে
ছিন্ন-রশারশি।
এখন কি আর আছে সে বল?
বুকের তলা তোর
ভরে উঠছে জলে।
অশ্রু সেঁচে চলবি কত--
আপন ভারে ভোর
তলিয়ে যাবি তলে।
এবার তবে ক্ষান্ত হ রে
ওরে শ্রান্ত তরী,
রাখ্ রে আনাগোনা।
বর্ষশেষের বাঁশি বাজে
সন্ধ্যা-গগন ভরি,
ওই যেতেছে শোনা।
এবার ঘুমো কূলের কোলে
বটের ছায়াতলে
ঘাটের পাশে রহি,
ঘটের ঘায়ে যেটুকু ঢেউ
উঠে তটের জলে
তারি আঘাত সহি।
ইচ্ছা যদি করিস তবে
এ পার হতে পারে
যাস রে খেয়া বেয়ে।
আনবে বহি গ্রামের বোঝা
ক্ষুদ্র ভারে ভারে
পাড়ার ছেলেমেয়ে।
ও পারেতে ধানের খোলা
এই পারেতে হাট,
মাঝে শীর্ণ নদী--
সন্ধ্যা সকাল করবি শুধু
এ-ঘাট ও-ঘাট
ইচ্ছা করিস যদি।
হায় রে মিছে প্রবোধ দেওয়া,
অবোধ তরী মম
আবার যাবে ভেসে।
কর্ণ ধরে বসেছে তার
যমদূতের সম
স্বভাব সর্বনেশে।
ঝড়ের নেশা ঢেউয়ের নেশা
ছাড়বে নাকো আর,
হায় রে মরণলুভী!
ঘাটে সে কি রইবে বাঁধা,
অদৃষ্টে যাহার
আছে নৌকাডুবি!
ভীরুতা - গভীর সুরে গভীর কথা শুনিয়ে দিতে তোরে সাহস নাহি পাই।
ভীরুতা
- ক্ষণিকা
-
গভীর সুরে গভীর কথা
শুনিয়ে দিতে তোরে
সাহস নাহি পাই।
মনে মনে হাসবি কিনা
বুঝব কেমন করে?
আপনি হেসে তাই
শুনিয়ে দিয়ে যাই--
ঠাট্টা করে ওড়াই সখী,
নিজের কথাটাই।
হাল্কা তুমি কর পাছে
হাল্কা করি ভাই,
আপন ব্যথাটাই।
সত্য কথা সরলভাবে
শুনিয়ে দিতে তোরে
সাহস নাহি পাই।
অবিশ্বাসে হাসবি কিনা
বুঝব কেমন করে?
মিথ্যা ছলে তাই
শুনিয়ে দিয়ে যাই,
উল্টা করে বলি আমি
সহজ কথাটাই।
ব্যর্থ তুমি কর পাছে
ব্যর্থ করি ভাই,
আপন ব্যথাটাই।
সোহাগ-ভরা প্রাণের কথা
শুনিয়ে দিতে তোরে
সাহস নাহি পাই।
সোহাগ ফিরে পাব কিনা
বুঝব কেমন করে?
কঠিন কথা তাই
শুনিয়ে দিয়ে যাই,
গর্বছলে দীর্ঘ করি
নিজের কথাটাই।
ব্যথা পাছে না পাও তুমি
লুকিয়ে রাখি তাই
নিজের ব্যথাটাই।
ইচ্ছা করে নীরব হয়ে
রহিব তোর কাছে,
সাহস নাহি পাই।
মুখের 'পরে বুকের কথা
উথ্লে ওঠে পাছে
অনেক কথা তাই
শুনিয়ে দিয়ে যাই,
কথার আড়ে আড়াল থাকে
মনের কথাটাই।
তোমায় ব্যথা লাগিয়ে শুধু
জাগিয়ে তুলি ভাই
আপন ব্যথাটাই।
ইচ্ছা করি সুদূরে যাই,
না আসি তোর কাছে।
সাহস নাহি পাই।
তোমার কাছে ভীরুতা মোর
প্রকাশ হয় রে পাছে
কেবল এসে তাই
দেখা দিয়েই যাই,
স্পর্ধাতলে গোপন করি
মনের কথাটাই।
নিত্য তব নেত্রপাতে
জ্বালিয়ে রাখি ভাই,
আপন ব্যথাটাই।
উৎসৃষ্ট - মিথ্যে তুমি গাঁথলে মালা নবীন ফুলে,
উৎসৃষ্ট
- ক্ষণিকা
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
-
মিথ্যে তুমি গাঁথলে মালা
নবীন ফুলে,
ভেবেছ কি কণ্ঠে আমার
দেবে তুলে?
দাও তো ভালোই, কিন্তু জেনো
হে নির্মলে,
আমার মালা দিয়েছি ভাই
সবার গলে।
যে-ক'টা ফুল ছিল জমা
অর্ঘ্যে মম
উদ্দেশেতে সবায় দিনু--
নমো নমঃ।
কেউ বা তাঁরা আছেন কোথা
কেউ জানে না,
কারো বা মুখ ঘোমটা-আড়ে
আধেক চেনা।
কেউ বা ছিলেন অতীত কালে
অবন্তীতে,
এখন তাঁরা আছেন শুধু
কবির গীতে।
সবার তনু সাজিয়ে মাল্যে
পরিচ্ছদে
কহেন বিধি "তুভ্যমহং
সম্প্রদদে'।
হৃদয় নিয়ে আজ কি প্রিয়ে
হৃদয় দেবে?
হায় ললনা, সে প্রার্থনা
ব্যর্থ এবে।
কোথায় গেছে সেদিন আজি
যেদিন মম
তরুণ-কালে জীবন ছিল
মুকুলসম,
সকল শোভা সকল মধু
গন্ধ যত
বক্ষোমাঝে বন্ধ ছিল
বন্দীমত।
আজ যে তাহা ছড়িয়ে গেছে
অনেক দূরে--
অনেক দেশে, অনেক বেশে,
অনেক সুরে।
কুড়িয়ে তারে বাঁধতে পারে
একটিখানে
এমনতরো মোহন-মন্ত্র
কেই বা জানে!
নিজের মন তো দেবার আশা
চুকেই গেছে,
পরের মনটি পাবার আশায়
রইনু বেঁচে।