Thursday, May 26, 2016

এসো শ্যামল সুন্দর আনো তব তাপহরা তৃষাহরা সঙ্গসুধা ।

এসো শ্যামল সুন্দর,
আনো তব তাপহরা তৃষাহরা সঙ্গসুধা।
বিরহিণী চাহিয়া আছে আকাশে॥
সে যে   ব্যথিত হৃদয় আছে বিছায়ে
তমালকুঞ্জপথে সজল ছায়াতে,
নয়নে জাগিছে করুণ রাগিণী॥
বকুলমুকুল রেখেছে গাঁথিয়া,
বাজিছে অঙ্গনে মিলনবাঁশরি।
আনো সাথে তোমার মন্দিরা
চঞ্চল নৃত্যের বাজিবে ছন্দে সে--
বাজিবে কঙ্কণ, বাজিবে কিঙ্কিণী,
ঝঙ্কারিবে মঞ্জীর রুণু রুণু॥
-
রাগ: দেশ
তাল: ত্রিতাল
রচনাকাল (বঙ্গাব্দ): 1344
রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ): 1937
স্বরলিপিকার: শান্তিদেব ঘোষ

চক্ষে আমার তৃষ্ণা ওগো তৃষ্ণা আমার বক্ষ জুড়ে ।

চক্ষে আমার তৃষ্ণা, ওগো তৃষ্ণা আমার বক্ষ জুড়ে।
আমি    বৃষ্টিবিহীন বৈশাখী দিন, সন্তাপে প্রাণ যায় যে পুড়ে॥
ঝড় উঠেছে তপ্ত হাওয়ায়,            মনকে সুদূর শূন্যে ধাওয়ায়--
অবগুণ্ঠন যায় যে উড়ে॥
যে-ফুল কানন করত আলো
কালো হয়ে সে শুকাল।
ঝরনারে কে দিল বাধা--            নিষ্ঠুর পাষাণে বাঁধা
দুঃখের শিখরচূড়ে॥
-
রাগ: বৃন্দাবনী সারং-আড়ানা
তাল: ঝাঁপতাল
রচনাকাল (বঙ্গাব্দ): ভাদ্র, ১৩৪৪
রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ): 1938
স্বরলিপিকার: দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

তপস্বিনী হে ধরণী ওই যে তাপের বেলা আসে --

তপস্বিনী হে ধরণী, ওই-যে তাপের বেলা আসে--
তপের আসনখানি প্রসারিল মৌন নীলাকাশে॥
অন্তরে প্রাণের লীলা হোক তব অন্তঃশীলা,
যৌবনের পরিসর শীর্ণ হোক হোমাগ্নিনিশ্বাসে॥
যে তব বিচিত্র তান উচ্ছ্বসি উঠিত বহু গীতে
এক হয়ে মিশে যাক মৌনমন্ত্রে ধ্যানের শান্তিতে।
সংযমে বাঁধুক লতা কুসুমিত চঞ্চলতা,
সাজুক লাবণ্যলক্ষ্ণী দৈন্যের ধূসর ধুলিবাসে॥
-
রাগ: রামকেলী-ভৈরবী
তাল: দাদরা-খেমটা
রচনাকাল (বঙ্গাব্দ): ৭ বৈশাখ, ১৩৩৩
রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ): 1926
স্বরলিপিকার: দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

মধ্যদিনের বিজন বাতায়নে

মধ্যদিনের বিজন বাতায়নে
ক্লান্তি-ভরা কোন্ বেদনার মায়া  স্বপ্নাভাসে ভাসে মনে-মনে॥
কৈশোরে যে সলাজ কানাকানি  খুঁজেছিল প্রথম প্রেমের বাণী
আজ কেন তাই তপ্ত হাওয়ায় হাওয়ায়  মর্মরিছে গহন বনে বনে॥
যে নৈরাশা গভীর অশ্রুজলে  ডুবেছিল বিস্মরণের তলে
আজ কেন সেই বনযূথীর বাসে  উচ্ছুসিল মধুর নিশ্বাসে,
সারাবেলা চাঁপার ছায়ায় ছায়ায়  গুঞ্জরিযা ওঠে ক্ষণে ক্ষণে॥

হে তাপস তব শুষ্ক কঠোর রূপের গভীর রসে

হে তাপস, তব শুষ্ক কঠোর রূপের গভীর রসে
মন আজি মোর উদাস বিভোর কোন্ সে ভাবের বশে॥
তব পিঙ্গল জটা  হানিছে দীপ্ত ছটা,
তব দৃষ্টির বহ্নিবৃষ্টি অন্তরে গিয়ে পশে॥
বুঝি না, কিছু না জানি
মর্মে আমার মৌন তোমার কী বলে রুদ্রবাণী।
দিগ্ দিগন্ত দহি  দুঃসহ তাপ বহি
তব নিশ্বাস আমার বক্ষে রহি রহি নিশ্বসে॥
সারা হয়ে এলে দিন
সন্ধ্যামেঘের মায়ার মহিমা নিঃশেষে হবে লীন।
দীপ্তি তোমার তবে  শান্ত হইয়া রবে,
তারায় তারায় নীরব মন্ত্রে ভরি দিবে শূন্য সে॥

শুষ্কতাপের দৈত্যপুরে দ্বার ভাঙবে বলে

শুষ্কতাপের দৈত্যপুরে দ্বার ভাঙবে ব’লে,
রাজপুত্র,  কোথা হতে হঠাৎ এলে চলে॥
সাত সমুদ্র- পারের থেকে   বজ্রস্বরে এলে হেঁকে,
দুন্দুভি যে উঠল বেজে বিষম কলরোলে॥
বীরের পদপরশ পেয়ে মূর্ছা হতে জাগে,
বসুন্ধরার তপ্ত প্রাণে বিপুল পুলক লাগে।
মরকতমণির থালা   সাজিয়ে গাঁথে বরণমালা,
উতলা তার হিয়া আজি সজল হাওয়ায় দোলে॥

বিরহ - তুমি যখন চলে গেলে তখন দুই পহর --

বিরহ
- ক্ষণিকা
-
তুমি যখন চলে গেলে
তখন দুই-পহর--
সূর্য তখন মাঝ-গগনে,
রৌদ্র খরতর।
ঘরের কর্ম সাঙ্গ করে
ছিলেম তখন একলা ঘরে,
আপন-মনে বসে ছিলেম
বাতায়নের 'পর।
তুমি যখন চলে গেলে
তখন দুই-পহর।
চৈত্র মাসের নানা খেতের
নানা গন্ধ নিয়ে
আসতেছিল তপ্ত হাওয়া
মুক্ত দুয়ার দিয়ে।
দুটি ঘুঘু সারাটা দিন
ডাকতেছিল শ্রান্তিবিহীন,
একটি ভ্রমর ফিরতেছিল
কেবল গুন্গুনিয়ে
চৈত্র মাসের নানা খেতের
নানা বার্তা নিয়ে।
তখন পথে লোক ছিল না,
ক্লান্ত কাতর গ্রাম।
ঝাউশাখাতে উঠতেছিল
শব্দ অবিশ্রাম।
আমি শুধু একলা প্রাণে
অতি সুদূর বাঁশির তানে
গেঁথেছিলেম আকাশ ভ'রে
একটি কাহার নাম।
তখন পথে লোক ছিল না,
ক্লান্ত কাতর গ্রাম।
ঘরে ঘরে দুয়ার দেওয়া,
আমি ছিলেম জেগে--
আবাঁধা চুল উড়তে ছিল
উদাস হাওয়া লেগে।
তটতরুর ছায়ার তলে
ঢেউ ছিল না নদীর জলে,
তপ্ত আকাশ এলিয়ে ছিল
শুভ্র অলস মেঘে।
ঘরে ঘরে দুয়ার দেওয়া,
আমি ছিলেম জেগে।
তুমি যখন চলে গেলে
তখন দুই-পহর,
শুষ্ক পথে দগ্ধ মাঠে
রৌদ্র খরতর।
নিবিড়-ছায়া বটের শাখে
কপোত দুটি কেবল ডাকে
একলা আমি বাতায়নে--
শূন্য শয়ন-ঘর।
তুমি যখন গেলে তখন
বেলা দুই-পহর।
-
শিলাইদহ, ২১ জ্যৈষ্ঠ, ১৩০৭