ওরে ঝড় নেমে আয়, আয় রে আমার শুকনো পাতার
ডালে,
এই বরষায় নবশ্যামের আগমনের কালে॥
যা উদাসীন, যা প্রাণহীন, যা আনন্দহারা,
চরম রাতের অশ্রুধারায় আজ হয়ে যাক সারা--
যাবার যাহা যাক সে চলে রুদ্র নাচের
তালে॥
আসন আমার পাততে হবে রিক্ত প্রাণের ঘরে,
নবীন বসন পরতে হবে সিক্ত বুকের 'পরে।
নদীর জলে বান ডেকেছে কূল গেল তার ভেসে,
যূথীবনের গন্ধবাণী ছুটল নিরুদ্দেশে--
পরান আমার জাগল বুঝি মরণ-অন্তরালে॥
-
রাগ: বাউল
তাল: কাহারবা
রচনাকাল (বঙ্গাব্দ): ৩ শ্রাবণ, ১৩৩৬
রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ): ১৯ জুলাই, ১৯২৯
রচনাস্থান: শান্তিনিকেতন
স্বরলিপিকার: দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর
Thursday, June 16, 2016
ওরে ঝড় নেমে আয় আয় রে আমার শুকনো পাতার ডালে
বজ্রমানিক দিয়ে গাঁথা আষাঢ় তোমার মালা ।
বজ্রমানিক দিয়ে গাঁথা, আষাঢ় তোমার মালা।
তোমার শ্যামল শোভার বুকে বিদ্যুতেরই জ্বালা ॥
তোমার মন্ত্রবলে পাষাণ গলে, ফসল ফলে--
মরু বহে আনে তোমার পায়ে ফুলের ডালা ॥
মরোমরো পাতায় পাতায় ঝরোঝরো বারির রবে
গুরুগুরু মেঘের মাদল বাজে তোমার কী উৎসবে।
সবুজ সুধার ধারায় প্রাণ এনে দাও তপ্ত ধারায়,
বামে রাখ ভয়ঙ্করী বন্যা মরণ-ঢালা ॥
-
রাগ: ঝিঁঝিট-বাউল
তাল: দাদরা
রচনাকাল (বঙ্গাব্দ): 1332
রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ): 1925
Thursday, June 9, 2016
চৌরপঞ্চাশিকা - ওগো সুন্দর চোর বিদ্যা তোমার কোন্ সন্ধ্যার কনকচাঁপার ডোর
চৌরপঞ্চাশিকা
- কল্পনা
-
ওগো সুন্দর চোর,
বিদ্যা তোমার কোন্ সন্ধ্যার
কনকচাঁপার ডোর!
কত বসন্ত চলি গেছে হায়,
কত কবি আজি কত গান গায়,
কোথা রাজবালা চিরশয্যায়--
ওগো সুন্দর চোর,
কোনো গানে আর ভাঙে না যে তার
অনন্ত ঘুমঘোর।
ওগো সুন্দর চোর,
কত কাল হল কবে সে প্রভাতে
তব প্রেমনিশি ভোর!
কবে নিবে গেছে নাহি তাহা লিখা
তোমার বাসরে দীপানলশিখা,
খসিয়া পড়েছে সোহাগলতিকা--
ওগো সুন্দর চোর,
শিথিল হয়েছে নবীন প্রেমের
বাহুপাশ সুকঠোর।
তবু সুন্দর চোর,
মৃত্যু হারায়ে কেঁদে কেঁদে ঘুরে
পঞ্চাশ শ্লোক তোর।
পঞ্চাশ বার ফিরিয়া ফিরিয়া
বিদ্যার নাম ঘিরিয়া ঘিরিয়া
তীব্র ব্যথায় মর্ম চিরিয়া
ওগো সুন্দর চোর,
যুগে যুগে তারা কাঁদিয়া মরিছে
মূঢ় আবেগে ভোর।
ওগো সুন্দর চোর,
অবোধ তাহারা, বধির তাহারা,
অন্ধ তাহারা ঘোর।
দেখে না শোনে না কে আসে কে যায়,
জানে না কিছুই কারে তারা চায়,
শুধু এক নাম এক সুরে গায়--
ওগো সুন্দর চোর,
না জেনে না বুঝে ব্যর্থ ব্যথায়
ফেলিছে নয়নলোর।
ওগো সুন্দর চোর,
এক সুরে বাঁধা পঞ্চাশ গাথা
শুনে মনে হয় মোর--
রাজভবনের গোপনে পালিত,
রাজবালিকার সোহাগে লালিত,
তব বুকে বসি শিখেছিল গীত
ওগো সুন্দর চোর,
পোষা শুক সারী মধুরকণ্ঠ
যেন পঞ্চাশ-জোড়।
ওগো সুন্দর চোর,
তোমারি রচিত সোনার ছন্দ-
পিঞ্জরে তারা ভোর।
দেখিতে পায় না কিছু চারি ধারে,
শুধু চিরনিশি গাহে বারে বারে
তোমাদের চির শয়নদুয়ারে--
ওগো সুন্দর চোর,
আজি তোমাদের দুজনের চোখে
অনন্ত ঘুমঘোর।
-
২৩ বৈশাখ, পরিবর্তিত-পরিবর্ধিত
৪ জৈষ্ঠ্য। কলিকাতা
বর্ষামঙ্গল - ঐ আসে ঐ অতি ভৈরব হরষে জলসিঞ্চিত ক্ষিতিসৌরভরভসে
বর্ষামঙ্গল
- কল্পনা
-
ঐ আসে ঐ অতি ভৈরব হরষে
জলসিঞ্চিত ক্ষিতিসৌরভরভসে
ঘনগৌরবে নবযৌবনা বরষা
শ্যামগম্ভীর সরসা।
গুরুগর্জনে নীল অরণ্য শিহরে,
উতলা কলাপী কেকাকলরবে বিহরে।
নিখিলচিত্তহরষা
ঘনগৌরবে আসিছে মত্ত বরষা।
কোথা তোরা অয়ি তরুণী পথিকললনা,
জনপদবধূ তড়িৎচকিতনয়না,
মালতীমালিনী কোথা প্রিয়পরিচারিকা,
কোথা তোরা অভিসারিকা!
ঘনবনতলে এসো ঘননীলবসনা,
ললিত নৃত্যে বাজুক স্বর্ণরশনা,
আনো বীণা মনোহারিকা।
কোথা বিরহিণী, কোথা তোরা অভিসারিকা!
আনো মৃদঙ্গ, মুরজ, মুরলী মধুরা,
বাজাও শঙ্খ, হুলুরব করো বধূরা--
এসেছে বরষা, ওগো নব-অনুরাগিণী,
ওগো প্রিয়সুখভাগিনী!
কুঞ্জকুটিরে, অয়ি ভাবাকুললোচনা,
ভূর্জপাতায় নব গীত করো রচনা
মেঘমল্লার-রাগিণী।
এসেছে বরষা, ওগো নব-অনুরাগিণী!
কেতকীকেশরে কেশপাশ করো সুরভি,
ক্ষীণ কটিতটে গাঁথি লয়ে পরো করবী,
কদম্বরেণু বিছাইয়া দাও শয়নে,
অঞ্জন আঁকো নয়নে।
তালে তালে দুটি কঙ্কণ কনকনিয়া
ভবনশিখীরে নাচাও গনিয়া গনিয়া
স্মিতবিকশিত বয়নে,
কদম্বরেণু বিছাইয়া ফুলশয়নে।
স্নিগ্ধসজল মেঘকজ্জল দিবসে
বিবশ প্রহর অচল অলস আবেশে,
শশীতারাহীনা অন্ধতামসী যামিনী--
কোথা তোরা পুরকামিনী!
আজিকে দুয়ার রুদ্ধ ভবনে ভবনে,
জনহীন পথ কাঁদিছে ক্ষুব্ধ পবনে,
চমকে দীপ্ত দামিনী--
শূন্যশয়নে কোথা জাগে পুরকামিনী!
যূথীপরিমল আসিছে সজল সমীরে,
ডাকিছে দাদুরী তমালকুঞ্জতিমিরে,
জাগো সহচরী, আজিকার নিশি ভুলো না--
নীপশাখে বাঁধো ঝুলনা।
কুসুমপরাগ ঝরিবে ঝলকে ঝলকে,
অধরে অধরে মিলন অলকে অলকে--
কোথা পুলকের তুলনা।
নীপশাখে সখী ফুলডোরে বাঁধো ঝুলনা।
এসেছে বরষা, এসেছে নবীনা বরষা,
গগন ভরিয়া এসেছে ভুবনভরসা--
দুলিছে পবনে সনসন বনবীথিকা,
গীতিময় তরুলতিকা।
শতেক যুগের কবিদলে মিলি আকাশে
ধ্বনিয়া তুলিছে মত্তমদির বাতাসে
শতেক যুগের গীতিকা--
শতশতগীতমুখরিত বনবীথিকা।
-
জোড়াসাঁকো ১৭ বৈশাখ, ১৩০৪
দুঃসময় - যদিও সন্ধ্যা আসিছে মন্দ মন্থরে
দুঃসময়
- কল্পনা
-
যদিও সন্ধ্যা আসিছে মন্দ মন্থরে,
সব সংগীত গেছে ইঙ্গিতে থামিয়া,
যদিও সঙ্গী নাহি অনন্ত অম্বরে,
যদিও ক্লান্তি আসিছে অঙ্গে নামিয়া,
মহা আশঙ্কা জপিছে মৌন মন্তরে,
দিক্-দিগন্ত অবগুণ্ঠনে ঢাকা--
তবু বিহঙ্গ, ওরে বিহঙ্গ মোর,
এখনি, অন্ধ, বন্ধ কোরো না পাখা।
এ নহে মুখর বনমর্মরগুঞ্জিত,
এ যে অজাগরগরজে সাগর ফুলিছে।
এ নহে কুঞ্জ কুন্দকুসুমরঞ্জিত,
ফেনহিল্লোল কলকল্লোলে দুলিছে।
কোথা রে সে তীর ফুলপল্লবপুঞ্জিত,
কোথা রে সে নীড়, কোথা আশ্রয়শাখা!
তবু বিহঙ্গ, ওরে বিহঙ্গ মোর,
এখনি, অন্ধ, বন্ধ কোরো না পাখা।
এখনো সমুখে রয়েছে সুচির শর্বরী,
ঘুমায় অরুণ সুদূর অস্ত-অচলে!
বিশ্বজগৎ নিশ্বাসবায়ু সম্বরি
স্তব্ধ আসনে প্রহর গনিছে বিরলে।
সবে দেখা দিল অকূল তিমির সন্তরি
দূর দিগন্তে ক্ষীণ শশাঙ্ক বাঁকা।
ওরে বিহঙ্গ, ওরে বিহঙ্গ মোর,
এখনি, অন্ধ, বন্ধ কোরো না পাখা।
ঊর্ধ্ব আকাশে তারাগুলি মেলি অঙ্গুলি
ইঙ্গিত করি তোমা-পানে আছে চাহিয়া।
নিম্নে গভীর অধীর মরণ উচ্ছলি
শত তরঙ্গ তোমা-পানে উঠে ধাইয়া।
বহুদূর তীরে কারা ডাকে বাঁধি অঞ্জলি
"এসো এসো' সুরে করুণ মিনতি-মাখা।
ওরে বিহঙ্গ, ওরে বিহঙ্গ মোর,
এখনি, অন্ধ, বন্ধ কোরো না পাখা।
ওরে ভয় নাই, নাই স্নেহমোহবন্ধন,
ওরে আশা নাই, আশা শুধু মিছে ছলনা।
ওরে ভাষা নাই, নাই বৃথা বসে ক্রন্দন,
ওরে গৃহ নাই, নাই ফুলশেজরচনা।
আছে শুধু পাখা, আছে মহানভ-অঙ্গন
উষা-দিশা-হারা নিবিড়-তিমির-আঁকা--
ওরে বিহঙ্গ, ওরে বিহঙ্গ মোর,
এখনি, অন্ধ, বন্ধ কোরো না পাখা।
-
জোড়াসাঁকো ১৫ বৈশাখ, ১৩০৪
Monday, May 30, 2016
পথিক মেঘের দল জোটে ওই শ্রাবণগগন অঙ্গনে ।
পথিক মেঘের দল জোটে ওই শ্রাবণগগন-অঙ্গনে।
শোন্ শোন্ রে, মন রে আমার,
উধাও হয়ে নিরুদ্দেশের সঙ্গ নে॥
দিক্-হারানো দুঃসাহসে সকল বাঁধন পড়ুক খসে,
কিসের বাধা ঘরের কোণের শাসনসীমা-
লঙ্ঘনে॥
বেদনা তোর বিজুলশিখা জ্বলুক অন্তরে।
সর্বনাশের করিস সাধন বজ্রমন্তরে।
অজানাতে করবি গাহন,
ঝড় সে পথের হবে বাহন--
শেষ করে দিস আপনারে তুই প্রলয়
রাতের ক্রন্দনে॥
-
রাগ: বাউল
তাল: দাদরা
রচনাকাল (বঙ্গাব্দ): ২৫ আষাঢ়, ১৩৩০
রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ): ১০ জুলাই, ১৯২৩
রচনাস্থান: শান্তিনিকেতন
পথিক মেঘের দল জোটে ওই শ্রাবণগগন অঙ্গনে ।
পথিক মেঘের দল জোটে ওই শ্রাবণগগন-অঙ্গনে।
শোন্ শোন্ রে, মন রে আমার,
উধাও হয়ে নিরুদ্দেশের সঙ্গ নে॥
দিক্-হারানো দুঃসাহসে সকল বাঁধন পড়ুক খসে,
কিসের বাধা ঘরের কোণের শাসনসীমা-
লঙ্ঘনে॥
বেদনা তোর বিজুলশিখা জ্বলুক অন্তরে।
সর্বনাশের করিস সাধন বজ্রমন্তরে।
অজানাতে করবি গাহন,
ঝড় সে পথের হবে বাহন--
শেষ করে দিস আপনারে তুই প্রলয়
রাতের ক্রন্দনে॥
-
রাগ: বাউল
তাল: দাদরা
রচনাকাল (বঙ্গাব্দ): ২৫ আষাঢ়, ১৩৩০
রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ): ১০ জুলাই, ১৯২৩
রচনাস্থান: শান্তিনিকেতন