Sunday, July 3, 2016

শেষের কবিতা - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (পর্ব-৭)

শেষের কবিতা (পর্ব-৭)
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
-
লাবণ্যের বাপ অবনীশ দত্ত এক পশ্চিমি কালেজের অধ্যক্ষ।
মাতৃহীন মেয়েকে এমন করে মানুষ করেছেন যে, বহু পরীক্ষা-
পাসের ঘষাঘষিতেও তার বিদ্যাবুদ্ধিতে লোকসান ঘটাতে পারে
নি। এমন-কি, এখনো তার পাঠানুরাগ রয়েছে প্রবল।

বাপের একমাত্র শখ ছিল বিদ্যায়, মেয়েটির মধ্যে তাঁর সেই
শখটির সম্পূর্ণ পরিতৃপ্তি হয়েছিল। নিজের লাইব্রেরির
চেয়েও তাকে ভালোবাসতেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, জ্ঞানের
চর্চায় যার মনটা নিরেট হয়ে ওঠে সেখানে উড়ো ভাবনার
গ্যাস নীচে থেকে ঠেলে ওঠবার মতো সমস্ত-ফাটল মরে যায়,
সে মানুষের পক্ষে বিয়ে করবার দরকার হয় না। তাঁর দৃঢ়
বিশ্বাস যে, তাঁর মেয়ের মনে স্বামীসেবা-আবাদের যোগ্য যে
নরম জমিটুকু বাকি থাকতে পারত সেটা গণিতে ইতিহাসে
সিমেণ্ট করে গাঁথা হয়েছে-- খুব মজবুত পাকা মন যাকে বলা
যেতে পারে-- বাইরে থেকে আঁচড় লাগলে দাগ পড়ে না। তিনি
এতদূর পর্যন্ত ভেবে রেখেছিলেন যে, লাবণ্যের নাই বা হল
বিয়ে, পাণ্ডিত্যের সঙ্গেই চিরদিন নয় গাঁঠবাঁধা হয়ে থাকল।

তাঁর আর-একটি স্নেহের পাত্র ছিল। তার নাম শোভনলাল।
অল্প বয়সে পড়ার প্রতি এত মনোযোগ আর কারো দেখা যায়
না। প্রশস্ত কপালে, চোখের ভাবের স্বচ্ছতায়, ঠোঁটের
ভাবের সৌজন্যে, হাসির ভাবের সরলতায়, মুখের ভাবের
সৌকুমার্যে তার চেহারাটি দেখবামাত্র মনকে টানে। মানুষটি
নেহাত মুখচোরা, তার প্রতি একটু মনোযোগ দিলে ব্যস্ত
হয়ে পড়ে।

গরিবের ছেলে, ছাত্রবৃত্তির সোপানে সোপানে দুর্গম
পরীক্ষার শিখরে শিখরে উত্তীর্ণ হয়ে চলেছে। ভবিষ্যতে
শোভন যে নাম করতে পারবে, আর সেই খ্যাতি গড়ে
তোলবার প্রধান কারিগরদের ফর্দে অবনীশের নামটা সকলের
উপরে থাকবে, এই গর্ব অধ্যাপকের মনে ছিল। শোভন আসত
তাঁর বাড়িতে পড়া নিতে, তাঁর লাইব্রেরিতে ছিল তার অবাধ
সঞ্চরণ। লাবণ্যকে দেখলে সে সংকোচে নত হয়ে যেত। এই
সংকোচের অতিদূরত্ববশত শোভনলালের চেয়ে নিজের
মাপটাকে বড়ো করে দেখতে লাবণ্যর বাধা ছিল না। দ্বিধা
করে নিজেকে যে-পুরুষ যথেষ্ট জোরের সঙ্গে প্রত্যক্ষ না
করায় মেয়েরা তাকে যথেষ্ট স্পষ্ট করে প্রত্যক্ষ করে না।

এমন সময় একদিন শোভনলালের বাপ ননীগোপাল অবনীশের
বাড়িতে চড়াও হয়ে তাঁকে খুব একচোট গাল পেড়ে গেল।
নালিশ এই যে, অবনীশ নিজের ঘরে অধ্যাপনার ছুতোয়
বিবাহের ছেলে-ধরা ফাঁদ পেতেছেন, বৈদ্যের ছেলে
শোভনলালের জাত মেরে সমাজ-সংস্কারের শখ মেটাতে চান।
এই অভিযোগের প্রমাণস্বরূপে পেন্সিলে-আঁকা লাবণ্যলতার
এক ছবি দাখিল করলে। ছবিটা আবিষ্কৃত হয়েছে শোভনলালের
টিনের প্যাঁটরার ভিতর থেকে, গোলাপফুলের পাপড়ি দিয়ে
আচ্ছন্ন। ননীগোপালের সন্দেহ ছিল না, এই ছবিটি
লাবণ্যেরই প্রণয়ের দান। পাত্র হিসাবে শোভনলালের বাজার-
দর যে কত বেশি, এবং আর কিছুদিন সবুর করে থাকলে সে
দাম যে কত বেড়ে যাবে ননীগোপালের হিসাবি বুদ্ধিতে সেটা
কড়ায়-গণ্ডায় মেলানো ছিল। এমন মূল্যবান জিনিসকে অবনীশ
বিনামূল্যে দখল করবার ফন্দি করছেন, এটাকে সিঁধ কেটে চুরি
ছাড়া আর কী নাম দেওয়া যেতে পারে। টাকা চুরির থেকে এর
লেশমাত্র তফাত কোথায়?

এতদিন লাবণ্য জানতেই পারে নি, কোনো প্রচ্ছন্ন বেদীতে
শ্রদ্ধাহীন লোকচক্ষুর অগোচরে তার মূর্তিপূজা প্রচলিত
হয়েছে। অবনীশের লাইব্রেরির এক কোণে নানাবিধ
প্যাম্ফ্লেট ম্যাগাজিন প্রভৃতি আবর্জনার মধ্যে লাবণ্যর
একটি অযত্নম্লান ফোটোগ্রাফ দৈবাৎ শোভনের হাতে
পড়েছিল, সেইটে নিয়ে ওর কোনো আর্টিস্ট বন্ধুকে দিয়ে ছবি
করিয়ে ফোটোগ্রাফটি আবার যথাস্থানে ফিরিয়ে রেখেছে।
গোলাপফুলগুলিও ওর তরুণ মনের সলজ্জ গোপন
ভালোবাসারই মতো সহজে ফুটেছিল একটি বন্ধুর বাগানে,
তার মধ্যে কোনো অনধিকার ঔদ্ধত্যের ইতিহাস নেই। অথচ
শাস্তি পেতে হল। লাজুক ছেলেটি মাথা হেঁট করে, মুখ লাল
করে, গোপনে চোখের জল মুছে এই বাড়ি থেকে বিদায় নিয়ে
গেল। দূর থেকে শোভনলাল তার আত্মনিবেদনের একটি শেষ
পরিচয় দিলে, সেই বিবরণটা অন্তর্যামী ছাড়া আর কেউ
জানত না। বি. এ. পরীক্ষায় সে যখন পেয়েছিল প্রথম স্থান,
লাবণ্য পেয়েছিল তৃতীয়। সেটাতে লাবণ্যকে বড়ো বেশি
আত্মলাঘব-দুঃখ দিয়েছিল। তার দুটো কারণ ছিল, এক হচ্ছে
শোভনের বুদ্ধির 'পরে অবনীশের অত্যন্ত শ্রদ্ধা নিয়ে
লাবণ্যকে অনেকদিন আঘাত করেছে। এই শ্রদ্ধার সঙ্গে
অবনীশের বিশেষ স্নেহ মিশে থাকাতে পীড়াটা আরো হয়েছিল
বেশি। শোভনকে পরীক্ষার ফলে ছাড়িয়ে যাবার জন্যে সে
চেষ্টা করেছিল খুব প্রাণপণেই। তবুও শোভন যখন তাকে
ছাড়িয়ে গেল তখন এই স্পর্ধার জন্যে তাকে ক্ষমা করাই
শক্ত হয়ে উঠল। তার মনে কেমন-একটা সন্দেহ লেগে রইল
যে, বাবা তাকে বিশেষভাবে সাহায্য করাতেই উভয়
পরীক্ষিতের মধ্যে ফলবৈষম্য ঘটল, অথচ পরীক্ষার পড়া
সম্বন্ধে শোভনলাল কোনোদিন অবনীশের কাছে এগোয় নি।
কিছুদিন পর্যন্ত শোভনলালকে দেখলেই লাবণ্য মুখ ফিরিয়ে
চলে যেত। এম. এ. পরীক্ষাতেও শোভনের প্রতিযোগিতায়
লাবণ্যর জেতবার কোনো সম্ভাবনা ছিল না। তবু হল জিত।
স্বয়ং অবনীশ আশ্চর্য হয়ে গেলেন। শোভনলাল যদি কবি হত
তা হলে হয়তো সে খাতা ভরে কবিতা লিখত-- তার বদলে
আপন পরীক্ষা-পাসের অনেকগুলো মোটা মার্কা সে লাবণ্যর
উদ্দেশে উৎসর্গ করে দিলে।

তার পরে এদের ছাত্রদশা গেল কেটে। এমন সময় অবনীশ
হঠাৎ প্রচণ্ড পীড়ায় নিজের মধ্যেই প্রমাণ পেলেন যে,
জ্ঞানের চর্চায় মনটা ঠাসবোঝাই থাকলেও মনসিজ তার
মধ্যেই কোথা থেকে বাধা ঠেলে উঠে পড়েন, একটুও
স্থানাভাব হয় না। তখন অবনীশ সাতচল্লিশ। সেই নিরতিশয়
দুর্বল নিরুপায় বয়সে একটি বিধবা তাঁর হৃদয়ে প্রবেশ করলে,
একেবারে তাঁর লাইব্রেরির গ্রন্থব্যূহ ভেদ করে, তাঁর
পাণ্ডিত্যের প্রাকার ডিঙিয়ে। বিবাহে আর কোনো বাধা ছিল
না, একমাত্র বাধা লাবণ্যর প্রতি অবনীশের স্নেহ। ইচ্ছার
সঙ্গে বিষম লড়াই বাধল। পড়াশুনো করতে যান খুবই জোরের
সঙ্গে, কিন্তু তার চেয়ে জোর আছে এমন কোনো-একটা
চমৎকারা চিন্তা পড়াশুনোর কাঁধে চেপে বসে। সমালোচনার
জন্যে মডার্ন রিভিয়ু থেকে তাঁকে লোভনীয় বই পাঠানো হয়
বৌদ্ধধ্বংসাবশেষের পুরাবৃত্ত নিয়ে-- অনুদ্ঘাটিত বইয়ের
সামনে স্থির হয়ে বসে থাকেন এক ভাঙা বৌদ্ধস্তূপেরই
মতো, যার উপরে চেপে আছে বহুশত বৎসরের মৌন।
সম্পাদক ব্যস্ত হয়ে ওঠেন, কিন্তু জ্ঞানীর স্তূপাকার
জ্ঞান যখন একবার টলে তখন তার দশা এইরকমই হয়ে
থাকে। হাতি যখন চোরাবালিতে পা দেয় তখন তার বাঁচবার
উপায় কী?

এতদিন পরে অবনীশের মনে একটা পরিতাপ ব্যথা দিতে
লাগল। তাঁর মনে হল, তিনি হয়তো পুঁথির পাতা থেকে চোখ
তুলে দেখবার অবকাশ না পাওয়াতে দেখেন নি যে,
শোভনলালকে তাঁর মেয়ে ভালোবেসেছে; কারণ, শোভনের
মতো ছেলেকে না ভালোবাসতে পারাটাই অস্বাভাবিক।
সাধারণভাবে বাপ-জাতটার 'পরেই রাগ ধরল-- নিজের উপরে,
ননীগোপালের 'পরে।

এমন সময় শোভনের কাছ থেকে এক চিঠি এল। প্রেমচাঁদ-
রায়চাঁদ বৃত্তির জন্যে গুপ্তরাজবংশের ইতিহাস আশ্রয় করে
পরীক্ষার প্রবন্ধ লিখবে বলে সে তাঁর লাইব্রেরি থেকে
গুটিকতক বই ধার চায়। তখনই তিনি তাকে বিশেষ আদর করে
চিঠি লিখলেন, বললেন, "পূর্বের মতোই আমার লাইব্রেরিতে
বসেই তুমি কাজ করবে, কিছুমাত্র সংকোচ করবে না।"

শোভনলালের মনটা চঞ্চল হয়ে উঠল। সে ধরে নিলে, এমন
উৎসাহপূর্ণ চিঠির পিছনে হয়তো লাবণ্যর সম্মতি প্রচ্ছন্ন
আছে। সে লাইব্রেরিতে আসতে আরম্ভ করলে। ঘরের মধ্যে
যাওয়া-আসার পথে দৈবাৎ কখনো ক্ষণকালের জন্যে লাবণ্যর
সঙ্গে দেখা হয়। তখন শোভন গতিটাকে একটু মন্দ করে
আনে। ওর একান্ত ইচ্ছে, লাবণ্য তাকে একটা-কোনো কথা
বলে; জিজ্ঞাসা করে, কেমন আছ; যে প্রবন্ধ নিয়ে ও
ব্যাপৃত সে সম্বন্ধে কিছু কৌতূহল প্রকাশ করে। যদি করত
তবে খাতা খুলে এক সময় লাবণ্যর সঙ্গে আলোচনা করতে
পারলে ও বেঁচে যেত। ওর কতকগুলি নিজের উদ্ভাবিত বিশেষ
মত সম্বন্ধে লাবণ্যর মত কী জানবার জন্যে ওর অত্যন্ত
ঔৎসুক্য। কিন্তু এ-পর্যন্ত কোনো কথাই হল না, গায়ে-পড়ে
কিছু বলতে পারে এমন সাহসও ওর নেই।

এমন কয়েক দিন যায়। সেদিন রবিবার। শোভনলাল তার
খাতাপত্র টেবিলের উপর সাজিয়ে একখানা বই নিয়ে পাতা
ওলটাচ্ছে, মাঝে মাঝে নোট নিচ্ছে। তখন দুপুরবেলা, ঘরে
কেউ নেই। ছুটির দিনের সুযোগ নিয়ে অবনীশ কোন্-এক
বাড়িতে যাচ্ছেন তার নাম করলেন না। বলে গেলেন, আজ আর
চা খেতে আসবেন না।

হঠাৎ এক সময় ভেজানো দরজা জোরে খুলে গেল।
শোভনলালের বুকটা ধড়াস করে উঠল কেঁপে। লাবণ্য ঘরে
ঢুকল। শোভন শশব্যস্ত হয়ে উঠে কী করবে ভেবে পেল না।
লাবণ্য অগ্নিমূর্তি ধরে বললে, "আপনি কেন এ বাড়িতে
আসেন?"

শোভনলাল চমকে উঠল, মুখে কোনো উত্তর এল না।

"আপনি জানেন, এখানে আসা নিয়ে আপনার বাবা কী বলেছেন?
আমার অপমান ঘটাতে আপনার সংকোচ নেই?"

শোভনলাল চোখ নিচু করে বললে, "আমাকে মাপ করবেন,
আমি এখনই যাচ্ছি।"

এমন উত্তর পর্যন্ত দিলে না যে, লাবণ্যর পিতা তাকে স্বয়ং
আমন্ত্রণ করে এনেছেন। সে তার খাতাপত্র সমস্ত সংগ্রহ
করে নিলে। হাত থর থর করে কাঁপছে; বোবা একটা ব্যথা
বুকের পাঁজরগুলোকে ঠেলা দিয়ে উঠতে চায়, রাস্তা পায় না।
মাথা হেঁট করে বাড়ি থেকে সে চলে গেল।

যাকে খুবই ভালোবাসা যেতে পারত তাকে ভালোবাসার অবসর
যদি কোনো-একটা বাধায় ঠেকে ফসকে যায়, তখন সেটা না-
ভালোবাসায় দাঁড়ায় না, সেটা দাঁড়ায় একটা অন্ধ বিদ্বেষে,
ভালোবাসারই উলটো পিঠে। একদিন শোভনলালকে বরদান
করবে বলেই বুঝি লাবণ্য নিজের অগোচরেই অপেক্ষা করে
বসে ছিল। শোভনলাল তেমন করে ডাক দিলে না। তার পরে
যা-কিছু হল সবই গেল তার বিরুদ্ধে। সকলের চেয়ে বেশি
আঘাত দিলে এই শেষকালটায়। লাবণ্য মনের ক্ষোভে বাপের
প্রতি নিতান্ত অন্যায় বিচার করলে। তার মনে হল, নিজে
নিষ্কৃতি পাবেন ইচ্ছে করেই শোভনলালকে তিনি আবার নিজে
থেকে ডেকে এনেছেন ওদের দুজনের মিলন ঘটাবার কামনায়।
তাই এমন দারুণ ক্রোধ হল সেই নিরপরাধের উপরে।

তার পর থেকে লাবণ্য ক্রমাগতই জেদ করে করে অবনীশের
বিবাহ ঘটালো। অবনীশ তাঁর সঞ্চিত টাকার প্রায় অর্ধাংশ
তাঁর মেয়ের জন্যে স্বতন্ত্র করে রেখেছিলেন। তাঁর বিবাহের
পরে লাবণ্য বলে বসল, সে তার পৈতৃক সম্পত্তি কিছুই নেবে
না, স্বাধীন উপার্জন করে চালাবে। অবনীশ মর্মাহত হয়ে
বললেন, "আমি তো বিয়ে করতে চাই নি লাবণ্য, তুমিই তো
জেদ করে বিয়ে দিইয়েছ। তবে কেন আজ আমাকে তুমি এমন
করে ত্যাগ করছ।"

লাবণ্য বললে, "আমাদের সম্বন্ধ কোনোকালে যাতে ক্ষুণ্ন
না হয় সেইজন্যেই আমি এই সংকল্প করেছি। তুমি কিছু
ভেবো না বাবা! যে পথে আমি যথার্থ সুখী হব সেই পথে
তোমার আশীর্বাদ চিরদিন রেখো।"

কাজ তার জুটে গেল। সুরমাকে পড়াবার সম্পূর্ণ ভার তার
উপরে। যতিকেও অনায়াসে পড়াতে পারত, কিন্তু মেয়ে-
শিক্ষয়িত্রীর কাছে পড়বার অপমান স্বীকার করতে যতি
কিছুতেই রাজি হল না।

প্রতিদিনের বাঁধা কাজে জীবন একরকম চলে যাচ্ছিল।
উদ্বৃত্ত সময়টা ঠাসা ছিল ইংরেজি সাহিত্যে, প্রাচীন কাল
থেকে আরম্ভ করে হালের বার্নার্ড্ শ'র আমল পর্যন্ত,
এবং বিশেষভাবে গ্রীক ও রোমান যুগের ইতিহাসে, গ্রোট,
গিবন ও গিলবার্ট্ মারের রচনায়। কোনো কোনো অবকাশে
একটা চঞ্চল হাওয়া এসে মনের ভিতরটা যে একটু
এলোমেলো করে যেত না তা বলতে পারি নে, কিন্তু হাওয়ার
চেয়ে স্থূল ব্যাঘাত হঠাৎ ঢুকে পড়তে পারে ওর জীবনযাত্রার
মধ্যে এমন প্রশস্ত ফাঁক ছিল না। এমন সময় ব্যাঘাত এসে
পড়ল মোটরগাড়িতে চড়ে, পথের মাঝখানে, কোনো
আওয়াজমাত্র না করে। হঠাৎ গ্রীস-রোমের বিরাট ইতিহাসটা
হালকা হয়ে গেল; আর সমস্ত-কিছুকে সরিয়ে দিয়ে অত্যন্ত
নিকটের একটা নিবিড় বর্তমান ওকে নাড়া দিয়ে বললে
"জাগো"। লাবণ্য এক মুহূর্তে জেগে উঠে এতদিন পরে
আপনাকে বাস্তবরূপে দেখতে পেলে-- জ্ঞানের মধ্যে নয়,
বেদনার মধ্যে।
-

Saturday, July 2, 2016

শেষের কবিতা - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (পর্ব-৬)

শেষের কবিতা (পর্ব-৬)
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
-
বাংলাদেশে ইংরেজি শিক্ষার প্রথম পর্যায়ে চণ্ডীমণ্ডপের
হাওয়ার সঙ্গে স্কুল-কলেজের হাওয়ার তাপের বৈষম্য ঘটাতে
সমাজবিদ্রোহের যে ঝড় উঠেছিল সেই ঝড়ের চাঞ্চল্যে ধরা
দিয়েছিলেন জ্ঞানদাশংকর। তিনি সেকালের লোক, কিন্তু তাঁর
তারিখটা হঠাৎ পিছলিয়ে সরে এসেছিল অনেকখানি একালে।
তিনি আগাম জন্মেছিলেন। বুদ্ধিতে বাক্যে ব্যবহারে তিনি
ছিলেন তাঁর বয়সের লোকদের অসমসাময়িক। সমুদ্রের ঢেউ-
বিলাসী পাখির মতো লোকনিন্দার ঝাপট বুক পেতে নিতেই
তাঁর আনন্দ ছিল।

এমন-সকল পিতামহের নাতিরা যখন এইরকম তারিখের
বিপর্যয় সংশোধন করতে চেষ্টা করে তখন তারা এক-দৌড়ে
পৌঁছয় পঞ্জিকার একেবারে উলটো দিকের টার্মিনসে। এ
ক্ষেত্রেও তাই ঘটল। জ্ঞানদাশংকরের নাতি বরদাশংকর
বাপের মৃত্যুর পর যুগ-হিসাবে বাপ-পিতামহের প্রায় আদিম
পূর্বপুরুষ হয়ে উঠলেন। মনসাকেও হাতজোড় করেন,
শীতলাকেও মা বলে ঠাণ্ডা করতে চান। মাদুলি ধুয়ে জল
খাওয়া শুরু হল; সহস্র দুর্গানাম লিখতে লিখতে দিনের
পূর্বাহ্ন যায় কেটে; তাঁর এলেকায় যে বৈশ্যদল নিজেদের
দ্বিজত্ব প্রমাণ করতে মাথা ঝাঁকা দিয়ে উঠেছিল অন্তরে
বাহিরে সকল দিক থেকেই তাদের বিচলিত করা হল,
হিন্দুত্বরক্ষার উপায়গুলিকে বিজ্ঞানের স্পর্শদোষ থেকে
বাঁচাবার উদ্দেশ্যে ভাটপাড়ার সাহায্যে অসংখ্য প্যাম্ফ্লেট
ছাপিয়ে আধুনিক বুদ্ধির কপালে বিনামূল্যে ঋষিবাক্যবর্ষণ
করতে কার্পণ্য করলেন না। অতি অল্পকালের মধ্যেই
ক্রিয়াকর্মে, জপে তপে, আসনে আচমনে, ধ্যানে স্নানে,
ধূপে ধুনোয়, গোব্রাহ্মণ-সেবায়, শুদ্ধাচারের অচল দুর্গ
নিশ্ছিদ্র করে বানালেন। অবশেষে গোদান, স্বর্ণদান,
ভূমিদান, কন্যাদায় পিতৃদায় মাতৃদায়-হরণ প্রভৃতির পরিবর্তে
অসংখ্য ব্রাহ্মণের অজস্র আশীর্বাদ বহন করে তিনি
লোকান্তরে যখন গেলেন তখন তাঁর সাতাশ বছর বয়স।

এঁরই পিতার পরম বন্ধু, তাঁরই সঙ্গে এক-কলেজে পড়া, একই
হোটেলে চপকাটলেট-খাওয়া রামলোচন বাঁড়ুজ্যের কন্যা
যোগমায়ার সঙ্গে বরদার বিবাহ হয়েছিল। ঠিক সেই সময়ে
যোগমায়ার পিতৃকুলের সঙ্গে পতিকুলের ব্যবহারগত বর্ণভেদ
ছিল না। এঁর বাপের ঘরে মেয়েরা পড়াশুনো করেন, বাইরে
বেরোন, এমন-কি, তাঁদের কেউ কেউ মাসিকপত্রে সচিত্র
ভ্রমণবৃত্তান্তও লিখেছেন। সেই বাড়ির মেয়ের শুচি
সংস্করণে যাতে অনুস্বার-বিসর্গের ভুলচুক না থাকে সেই
চেষ্টায় লাগলেন তাঁর স্বামী। সনাতন সীমান্ত-রক্ষা-নীতির
অটল শাসনে যোগমায়ার গতিবিধি বিবিধ পাসপোর্ট প্রণালীর
দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হল। চোখের উপরে তাঁর ঘোমটা নামল,
মনের উপরেও। দেবী সরস্বতী যখন কোনো অবকাশে এঁদের
অন্তঃপুরে প্রবেশ করতেন তখন পাহারায় তাঁকেও কাপড়ঝাড়া
দিয়ে আসতে হত। তাঁর হাতের ইংরেজি বইগুলো বাইরেই হত
বাজেয়াপ্ত, প্রাগ্বঙ্কিম বাংলাসাহিত্যের পরবর্তী রচনা ধরা
পড়লে চৌকাঠ পার হতে পেত না। যোগবাশিষ্ঠ রামায়ণের
উৎকৃষ্ট বাঁধাই বাংলা অনুবাদ যোগমায়ার শেলফে অনেক কাল
থেকে অপেক্ষা করে আছে। অবসর-বিনোদন উপলক্ষে সেটা
তিনি আলোচনা করবেন এমন একটা আগ্রহ এ বাড়ির
কর্তৃপক্ষের মনে অন্তিমকাল পর্যন্তই ছিল। এই পৌরাণিক
লোহার সিন্দুকের মধ্যে নিজেকে সেফ-ডিপজিটের মতো ভাঁজ
করে রাখা যোগমায়ার পক্ষে সহজ ছিল না, তবু বিদ্রোহী
মনকে শাসনে রেখেছিলেন। এই মানসিক অবরোধের মধ্যে
তাঁর একমাত্র আশ্রয় ছিলেন দীনশরণ বেদান্তরত্ন-- এঁদের
সভাপণ্ডিত। যোগমায়ার স্বাভাবিক স্বচ্ছ বুদ্ধি তাঁকে
অত্যন্ত ভালো লেগেছিল। তিনি স্পষ্টই বলতেন, "মা, এ-
সমস্ত ক্রিয়াকর্মের জঞ্জাল তোমার জন্যে নয়। যারা মূঢ়
তারা কেবল যে নিজেদেরকে নিজেরাই ঠকায় তা নয়,
পৃথিবীসুদ্ধ সমস্ত কিছুই তাদের ঠকাতে থাকে। তুমি কি মনে
কর আমরা এ-সমস্ত বিশ্বাস করি। দেখ নি কি, বিধান দেবার
বেলায় আমরা প্রয়োজন বুঝে শাস্ত্রকে ব্যাকরণের প্যাঁচে
উলটপালট করতে দুঃখ বোধ করি না। তার মানে, মনের মধ্যে
আমরা বাঁধন মানি নে, বাইরে আমাদের মূঢ় সাজতে হয় মূঢ়দের
খাতিরে। তুমি নিজে যখন ভুলতে চাও না তখন তোমাকে
ভোলাবার কাজ আমার দ্বারা হবে না। যখন ইচ্ছা করবে, মা,
আমাকে ডেকে পাঠিয়ো, আমি যা সত্য বলে জানি তাই
তোমাকে শাস্ত্র থেকে শুনিয়ে যাব।"

এক-একদিন তিনি এসে যোগমায়াকে কখনো গীতা কখনো
ব্রহ্মভাষ্য থেকে ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে যেতেন। যোগমায়া
তাঁকে এমন বুদ্ধিপূর্বক প্রশ্ন করতেন যে,
বেদান্তরত্নমশায় পুলকিত হয়ে উঠতেন; এঁর কাছে
আলোচনায় তাঁর উৎসাহের অন্ত থাকত না। বরদাশংকর তাঁর
চারি দিকে ছোটোবড়ো যে-সব গুরু ও গুরুতরদের জুটিয়েছিলেন
তাদের প্রতি বেদান্তরত্নমশায়ের বিপুল অবজ্ঞা ছিল। তিনি
যোগমায়াকে বলতেন, "মা, সমস্ত শহরে একমাত্র এই
তোমার ঘরে কথা কয়ে আমি সুখ পাই। তুমি আমাকে
আত্মধিক্কার থেকে বাঁচিয়েছ।" এমনি করে কিছুকাল
নিরবকাশ ব্রত-উপবাসের মধ্যে পঞ্জিকার শিকলি-বাঁধা
দিনগুলো কোনোমতে কেটে গেল। জীবনটা আগাগোড়াই হয়ে
উঠল আজকালকার খবরের-কাগজি কিম্ভূত ভাষায় যাকে বলে
"বাধ্যতামূলক"। স্বামীর মৃত্যুর পরেই তাঁর ছেলে যতিশংকর
ও মেয়ে সুরমাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন। শীতের সময় থাকেন
কলকাতায়, গরমের সময়ে কোনো-একটা পাহাড়ে। যতিশংকর
এখন পড়ছে কলেজে; কিন্তু সুরমাকে পড়াবার মতো কোনো
মেয়ে-বিদ্যালয় তাঁর পছন্দ না হওয়াতে বহু সন্ধানে তার
শিক্ষার জন্যে লাবণ্যলতাকে পেয়েছেন। তারই সঙ্গে আজ
সকালে আচমকা অমিতর দেখা।
-

শেষের কবিতা - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (পর্ব-৫)

শেষের কবিতা (পর্ব-৫)
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
-
আঁকাবাঁকা সরু রাস্তা, ডান দিকে জঙ্গলে ঢাকা খাদ। এ
রাস্তার শেষ লক্ষ্য অমিতর বাসা। সেখানে যাত্রী-সম্ভাবনা
নেই, তাই সে আওয়াজ না করে অসতর্কভাবে গাড়ি হাঁকিয়ে
চলেছে। ঠিক সেই সময়টা ভাবছিল, আধুনিক কালে দূরবর্তিনী
প্রেয়সীর জন্যে মোটর-দূতটাই প্রশস্ত-- তার মধ্যে
"ধূমজ্যোতিঃসলিলমরুতাং সন্নিপাতঃ" বেশ ঠিক পরিমাণেই
আছে-- আর, চালকের হাতে একখানি চিঠি দিলে কিছুই
অস্পষ্ট থাকে না। ও ঠিক করে নিলে আগামী বৎসরে
আষাঢ়ের প্রথম দিনেই মেঘদূতবর্ণিত রাস্তা দিয়েই মোটরে
করে যাত্রা করবে, হয়তো বা অদৃষ্ট ওর পথ চেয়ে
"দেহলীদত্তপুষ্পা" যে পথিকবধূকে এতকাল বসিয়ে রেখেছে
সেই অবন্তিকা হোক বা মালবিকাই হোক, বা হিমালয়ের
কোনো দেবদারুবনচারিণীই হোক, ওকে হয়তো কোনো-একটা
অভাবনীয় উপলক্ষে দেখা দিতেও পারে। এমন সময়ে হঠাৎ
একটা বাঁকের মুখে এসেই দেখলে আর-একটা গাড়ি উপরে
উঠে আসছে। পাশ কাটাবার জায়গা নেই। ব্রেক কষতে কষতে
গিয়ে পড়ল তার উপরে-- পরস্পর আঘাত লাগল, কিন্তু
অপঘাত ঘটল না। অন্য গাড়িটা খানিকটা গড়িয়ে পাহাড়ের গায়ে
আটকে থেমে গেল।

একটি মেয়ে গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়াল। সদ্য-মৃত্যু-আশঙ্কার
কালো পটখানা তার পিছনে, তারই উপরে সে যেন ফুটে উঠল
একটি বিদ্যুৎরেখায় আঁকা সুস্পষ্ট ছবি-- চারি দিকের সমস্ত
হতে স্বতন্ত্র। মন্দরপর্বতের নাড়া-খাওয়া ফেনিয়ে-ওঠা
সমুদ্র থেকে এইমাত্র উঠে এলেন লক্ষ্মী, সমস্ত
আন্দোলনের উপরে-- মহাসাগরের বুক তখনো ফুলে ফুলে
কেঁপে উঠছে। দুর্লভ অবসরে অমিত তাকে দেখলে।
ড্রয়িংরুমে এ মেয়ে অন্য পাঁচজনের মাঝখানে পরিপূর্ণ
আত্মস্বরূপে দেখা দিত না। পৃথিবীতে হয়তো দেখবার যোগ্য
লোক পাওয়া যায়, তাকে দেখবার যোগ্য জায়গাটি পাওয়া যায়
না।

মেয়েটির পরনে সরু-পাড়-দেওয়া সাদা আলোয়ানের শাড়ি, সেই
আলোয়ানেরই জ্যাকেট, পায়ে সাদা চামড়ার দিশি ছাঁদের
জুতো। তনু দীর্ঘ দেহটি, বর্ণ চিকন শ্যাম, টানা চোখ ঘন
পক্ষ্মচ্ছায়ায় নিবিড় স্নিগ্ধ, প্রশস্ত ললাট অবারিত করে
পিছু হটিয়ে চুল আঁট করে বাঁধা, চিবুক ঘিরে সুকুমার মুখের
ডৌলটি একটি অনতিপক্ক ফলের মতো রমণীয়। জ্যাকেটের
হাত কব্জি পর্যন্ত, দু-হাতে দুটি সরু প্লেন বালা। ব্রোচের-
বন্ধনহীন কাঁধের কাপড় মাথায় উঠেছে, কটকি কাজ-করা
রুপোর কাঁটা দিয়ে খোঁপার সঙ্গে বদ্ধ।

অমিত গাড়িতে টুপিটা খুলে রেখে তার সামনে চুপ করে এসে
দাঁড়াল। যেন একটা পাওনা শাস্তির অপেক্ষায়। তাই দেখে
মেয়েটির বুঝি দয়া হল, একটু কৌতুকও বোধ করলে। অমিত
মৃদুস্বরে বললে, "অপরাধ করেছি।"

মেয়েটি হেসে বললে, "অপরাধ নয়, ভুল। সেই ভুলের শুরু
আমার থেকেই।"

উৎসজলের যে উচ্ছলতা ফুলে ওঠে, মেয়েটির কণ্ঠস্বর তারই
মতো নিটোল। অল্প-বয়সের বালকের গলার মতো মসৃণ এবং
প্রশস্ত। সেদিন ঘরে ফিরে এসে অমিত অনেকক্ষণ
ভেবেছিল, এর গলার সুরে যে-একটি স্বাদ আছে স্পর্শ আছে,
তাকে বর্ণনা করা যায় কী করে। নোট-বইখানা খুলে লিখলে,
"এ যেন অম্বুরি তামাকের হালকা ধোঁওয়া, জলের ভিতর দিয়ে
পাক খেয়ে আসছে-- নিকোটিনের ঝাঁজ নেই, আছে গোলাপ
জলের স্নিগ্ধ গন্ধ।"

মেয়েটি নিজের ত্রুটি ব্যাখ্যা করে বললে, "একজন বন্ধু
আসার খবর পেয়ে খুঁজতে বেরিয়েছিলুম। এই রাস্তায় খানিকটা
উঠতেই শোফার বলেছিল, এ রাস্তা হতে পারে না। তখন শেষ
পর্যন্ত না গিয়ে ফেরবার উপায় ছিল না। তাই উপরে
চলেছিলেম। এমন সময় উপরওয়ালার ধাক্কা খেতে হল।"

অমিত বললে, "উপরওয়ালার উপরেও উপরওয়ালা আছে--
একটা অতি কুশ্রী কুটিল গ্রহ, এ তারই কুকীর্তি।"

অপর পক্ষের ড্রাইভার জানালে, "লোকসান বেশি হয় নি,
কিন্তু গাড়ি সেরে নিতে দেরি হবে।"

অমিত বললে, "আমার অপরাধী গাড়িটাকে যদি ক্ষমা করেন
তবে আপনি যেখানে অনুমতি করবেন সেইখানেই পৌঁছিয়ে
দিতে পারি।"

"দরকার হবে না, পাহাড়ে হেঁটে চলা আমার অভ্যেস।"

"দরকার আমারই, মাপ করলেন তার প্রমাণ।"

মেয়েটি ঈষৎ দ্বিধায় নীরব রইল। অমিত বললে, "আমার
তরফে আরো একটু কথা আছে। গাড়ি হাঁকাই-- বিশেষ একটা
মহৎ কর্ম নয়-- এ গাড়ি চালিয়ে পস্টারিটি পর্যন্ত পৌঁছবার
পথ নেই। তবু আরম্ভে এই একটিমাত্র পরিচয়ই পেয়েছেন।
অথচ এমনি কপাল, সেটুকুর মধ্যেও গলদ। উপসংহারে এটুকু
দেখাতে দিন যে, জগতে অন্তত আপনার শোফারের চেয়ে
আমি অযোগ্য নই।"

অপরিচিতের সঙ্গে প্রথম পরিচয়ের অজানা বিপদের
আশঙ্কায় মেয়েরা সংকোচ সরাতে চায় না। কিন্তু বিপদের
এক ধাক্কায় উপক্রমণিকার অনেকখানি বিস্তৃত বেড়া এক
দমে গেল ভেঙে। কোন্ দৈব নির্জন পাহাড়ের পথে হঠাৎ
মাঝখানে দাঁড় করিয়ে দুজনের মনে দেখাদেখির গাঁঠ বেঁধে
দিলে; সবুর করলে না। আকস্মিকের বিদ্যুৎ-আলোতে এমন
করে যা চোখে পড়ল, প্রায় মাঝে মাঝে এ যে রাত্রে জেগে
উঠে অন্ধকারের পটে দেখা যাবে। চৈতন্যের মাঝখানটাতে
তার গভীর ছাপ পড়ে গেল, নীল আকাশের উপরে সৃষ্টির কোন্
এক প্রচণ্ড ধাক্কায় যেমন সূর্য-নক্ষত্রের আগুন-জ্বলা
ছাপ।

মুখে কথা না বলে মেয়েটি গাড়িতে উঠে বসল। তার
নির্দেশমত গাড়ি পৌঁছল যথাস্থানে। মেয়েটি গাড়ি থেকে
মেমে বললে, "কাল যদি আপনার সময় থাকে একবার এখানে
আসবেন, আমাদের কর্তা-মার সঙ্গে আপনার আলাপ করিয়ে
দেব।"

অমিতর ইচ্ছে হল বলে, "আমার সময়ের অভাব নেই, এখনই
আসতে পারি।' সংকোচে বলতে পারলে না।

বাড়ি ফিরে এসে ওর নোট-বই নিয়ে লিখতে লাগল, "পথ আজ
হঠাৎ এ কী পাগলামি করলে। দুজনকে দু জায়গা থেকে ছিঁড়ে
এনে আজ থেকে হয়তো এক রাস্তায় চালান করে দিলে।
অ্যাস্ট্রনমার ভুল বলেছে। অজানা আকাশ থেকে চাঁদ এসে
পড়েছিল পৃথিবীর কক্ষপথে-- লাগল তাদের মোটরে মোটরে
ধাক্কা, সেই মরণের তাড়নার পর থেকে যুগে যুগে দুজনে
একসঙ্গেই চলেছে; এর আলো ওর মুখে পড়ে, ওর আলো
এর মুখে। চলার বাঁধন আর ছেঁড়ে না। মনের ভিতরটা বলছে,
আমাদের শুরু হল যুগলচলন, আমরা চলার সূত্রে গাঁথব ক্ষণে
ক্ষণে কুড়িয়ে-পাওয়া উজ্জ্বল নিমেষগুলির মালা। বাঁধা
মাইনেয় বাঁধা খোরাকিতে ভাগ্যের দ্বারে পড়ে থাকবার জো
রইল না; আমাদের দেনাপাওনা সবই হবে হঠাৎ।"

বাইরে বৃষ্টি পড়ছে। বারান্দায় ঘন ঘন পায়চারি করতে করতে
অমিত মনে মনে বলে উঠল, "কোথায় আছ নিবারণ
চক্রবর্তী। এইবার ভর করো আমার 'পরে, বাণী দাও, বাণী
দাও!' বেরোল লম্বা সরু খাতাটা, নিবারণ চক্রবর্তী বলে
গেল--

               পথ বেঁধে দিল বন্ধনহীন গ্রন্থি,
               আমরা দুজন চলতি হাওয়ার পন্থী।
                         রঙিন নিমেষ ধুলার দুলাল
                         পরানে ছড়ায় আবীর গুলাল,
                                   ওড়না ওড়ায় বর্ষার মেঘে
                                       দিগঙ্গনার নৃত্য;
                         হঠাৎ-আলোর ঝলকানি লেগে
                                ঝলমল করে চিত্ত।

               নাই আমাদের কনক-চাঁপার কুঞ্জ,
               বনবীথিকায় কীর্ণ বকুলপুঞ্জ।
                         হঠাৎ কখন সন্ধেবেলায়
                         নামহারা ফুল গন্ধ এলায়,
                         প্রভাতবেলায় হেলাভরে করে
                                   অরুণ মেঘেরে তুচ্ছ
                   উদ্ধত যত শাখার শিখরে
                         রডোডেনড্রনগুচ্ছ।

               নাই আমাদের সঞ্চিত ধনরত্ন,
               নাই রে ঘরের লালন ললিত যত্ন।
                         পথপাশে পাখি পুচ্ছ নাচায়,
                         বন্ধন তারে করি না খাঁচায়,
                                   ডানা-মেলে-
দেওয়া মুক্তিপ্রিয়ের
                                           কূজনে দুজনে তৃপ্ত।
                             আমরা চকিত অভাবনীয়ের
                                   ক্কচিৎ-কিরণে দীপ্ত।

এইখানে একবার পিছন ফেরা চাই। পশ্চাতের কথাটা সেরে
নিতে পারলে গল্পটার সামনে এগোবার বাধা হবে না।
-