Thursday, August 24, 2017

ওহে দয়াময়, নিখিল-আশ্রয় এ ধরা-পানে চাও

ওহে দয়াময়, নিখিল-আশ্রয়  এ ধরা-পানে চাও—
পতিত যে জন করিছে রোদন, পতিতপাবন,
       তাহারে উঠাও।
মরণে যে জন করেছে বরণ  তাহারে বাঁচাও।।
কত দুখ শোক,কাঁদে কত লোক,নয়ন মুছাও।
ভাঙিয়া আলয় হেরে শূন্যময়। কোথায় আশ্রয়—
       তারে ঘরে ডেকে নাও।
প্রেমের তৃষায় হৃদয় শুকায়, দাও প্রেমসুধা দাও।।
হেরো কোথা যায়, কার পানে চায়। নয়নে আঁধার—
নাহি হেরে দিক, আকুল পথিক চাহে চারি ধার।
এ ঘোর গহনে অন্ধ সে নয়নে তোমার কিরণে
       আঁধার ঘুচাও।
সঙ্গহারা জনে রাখিয়া চরণে বাসনা পূরাও।।
কলঙ্কের রেখা প্রাণে দেয় দেখা প্রতিদিন হায়।
হৃদয় কঠিন হল দিন দিন, লজ্জা দূরে যায়।
দেহো গো বেদনা,করাও চেতনা! রেখো না,রেখো না —
       এ পাপ তাড়াও
সংসারের রণে পরাজিত জনে নববল দাও।।
-
রাগ: বিলাতি ভাঙা
তাল: কাহারবা
রচনাকাল (বঙ্গাব্দ): 1291
রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ): 1885
স্বরলিপিকার: ইন্দিরা দেবী

এমন আর কতদিন চলে যাবে রে

এমন আর কতদিন চলে যাবে রে!
জীবনের ভার বহিব কত! হায় হায়!
যে আশা মনে ছিল, সকলই ফুরাইল—
       কিছু হল না জীবনে।
জীবন ফুরায়ে এল। হায় হায়।।
-
রাগ: সরফর্দা-বিলাবল
তাল: ত্রিতাল
রচনাকাল (বঙ্গাব্দ): 1291
রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ): 1885
স্বরলিপিকার: ইন্দিরা দেবী

সমাপ্তি - পথে যতদিন ছিনু ততদিন অনেকের সনে দেখা

সমাপ্তি
- ক্ষণিকা
-
পথে যতদিন ছিনু ততদিন অনেকের সনে দেখা।
সব শেষ হল যেখানে সেথায় তুমি আর আমি একা।
নানা বসন্তে নানা বরষায়
অনেক দিবসে অনেক নিশায়
দেখেছি অনেক, সহেছি অনেক,
লিখেছি অনেক লেখা--
পথে যতদিন ছিনু ততদিন অনেকের সনে দেখা।

কখন যে পথ আপনি ফুরালো, সন্ধ্যা হল যে কবে!
পিছনে চাহিয়া দেখিনু কখন চলিয়া গিয়াছে সবে।
তোমার নীরব নিভৃত ভবনে
জানি না কখন পশিনু কেমনে।
অবাক রহিনু আপন প্রাণের নূতন গানের রবে।
কখন যে পথ আপনি ফুরালো, সন্ধ্যা হল যে কবে!

চিহ্ন কি আছে শ্রান্ত নয়নে অশ্রুজলের রেখা?
বিপুল পথের বিবিধ কাহিনী আছে কি ললাটে
লেখা?
            রুধিয়া দিয়েছ তব বাতায়ন,
বিছানো রয়েছে শীতল শয়ন,
তোমার সন্ধ্যাপ্রদীপ-আলোকে তুমি আর আমি একা।
নয়নে আমার অশ্রুজলের চিহ্ন কি যায় দেখা!

অন্তরতম - আমি যে তোমায় জানি, সে তো কেউ জানে না

অন্তরতম
- ক্ষণিকা
-
আমি যে তোমায় জানি, সে তো কেউ জানে না।
তুমি মোর পানে চাও, সে তো কেউ    মানে না।
মোর মুখে পেলে তোমার আভাস
কত জনে কত করে পরিহাস,
পাছে সে না পারি সহিতে
নানা ছলে তাই ডাকি যে তোমায়--
কেহ কিছু নারে কহিতে।

তোমার পথ যে তুমি চিনায়েছ
সে কথা বলি নে কাহারে।
সবাই ঘুমালে জনহীন রাতে
একা আসি তব দুয়ারে।
স্তব্ধ তোমার উদার আলয়,
বীণাটি বাজাতে মনে করি ভয়,
চেয়ে থাকি শুধু নীরবে।
চকিতে তোমার ছায়া দেখি যদি
ফিরে আসি তব গরবে।

প্রভাত না হতে কখন আবার
গৃহকোণ-মাঝে আসিয়া
বাতায়নে বসি বিহ্বল বীণা
বিজনে বাজাই হাসিয়া।
পথ দিয়ে যে বা আসে যে বা যায়
সহসা থমকি চমকিয়া চায়,
মনে করে তারে ডেকেছি--
জানে না তো কেহ কত নাম দিয়ে
এক নামখানি ঢেকেছি।

ভোরের গোলাপ সে গানে সহসা
সাড়া দেয় ফুলকাননে,
ভোরের তারাটি সে গানে জাগিয়া
চেয়ে দেখে মোর আননে।
সব সংসার কাছে আসে ঘিরে,
প্রিয়জন সুখে ভাসে আঁখিনীরে,
হাসি জেগে ওঠে ভবনে।
যে নামে যে ছলে বীণাটি বাজাই
সাড়া পাই সারা ভুবনে।

নিশীথে নিশীথে বিপুল প্রাসাদে
তোমার মহলে মহলে
হাজার হাজার সোনার প্রদীপ
জ্বলে অচপল অনলে।
মোর দীপে জ্বেলে তাহারি আলোক
পথ দিয়ে আসি, হাসে কত লোক,
দূরে যেতে হয় পালায়ে--
তাই তো শিখা সে ভবনশিখরে
পারি নে রাখিতে জ্বালায়ে।

বলি নে তো কারে, সকালে বিকালে
তোমার পথের মাঝেতে
বাঁশি বুকে লয়ে বিনা কাজে আসি
বেড়াই ছদ্মসাজেতে।
যাহা মুখে আসে গাই সেই গান
নানা রাগিণীতে দিয়ে নানা তান,
এক গান রাখি গোপনে।
নানা মুখপানে আঁখি মেলি চাই,
তোমা-পানে চাই স্বপনে।
-
৩ আষাঢ়

কল্যাণী - বিরল তোমার ভবনখানি পুষ্পকাননমাঝে

কল্যাণী
- ক্ষণিকা
-
বিরল তোমার ভবনখানি
পুষ্পকাননমাঝে,
হে কল্যাণী নিত্য আছ
আপন গৃহকাজে।
বাইরে তোমার আম্রশাখে
স্নিগ্ধরবে কোকিল ডাকে,
ঘরে শিশুর কলধ্বনি
আকুল হর্ষভরে।
সর্বশেষের গানটি আমার
আছে তোমার তরে।

প্রভাত আসে তোমার দ্বারে,
পূজার সাজি ভরি,
সন্ধ্যা আসে সন্ধ্যারতির
বরণডালা ধরি।
সদা তোমার ঘরের মাঝে
নীরব একটি শঙ্খ বাজে,
কাঁকন-দুটির মঙ্গলগীত
উঠে মধুর স্বরে।
সর্বশেষের গানটি আমার
আছে তোমার তরে।

রূপসীরা তোমার পায়ে
রাখে পূজার থালা,
বিদুষীরা তোমার গলায়
পরায় বরমালা!
ভালে তোমার আছে লেখা
পুণ্যধামের রশ্মিরেখা,
সুধাস্নিগ্ধ হৃদয়খানি
হাসে চোখের 'পরে।
সর্বশেষের গানটি আমার
আছে তোমার তরে।

তোমার নাহি শীত বসন্ত,
জরা কি যৌবন--
সর্বঋতু সর্বকালে
তোমার সিংহাসন।
নিবে নাকো প্রদীপ তব,
পুষ্প তোমার নিত্য নব,
অচলা শ্রী তোমায় ঘেভ্রির
চির বিরাজ করে।
সর্বশেষের গানটি আমার
আছে তোমার তরে।
নদীর মতো এসেছিলে
গিরিশিখর হতে,
নদীর মতো সাগর-পানে
চল অবাধ স্রোতে।
একটি গৃহে পড়ছে লেখা
সেই প্রবাহের গভীর রেখা,
দীপ্ত শিরে পুণ্যশীতল
তীর্থসলিল ঝরে।
সর্বশেষের গানটি আমার
আছে তোমার তরে।

তোমার শান্তি পান্থজনে
ডাকে গৃহের পানে,
তোমার প্রীতি ছিন্ন জীবন
গেঁথে গেঁথে আনে।
আমার কাব্যকুঞ্জবনে
কত অধীর সমীরণে
কত যে ফুল কত আকুল
মুকুল খসে পড়ে--
সর্বশেষের শ্রেষ্ঠ যে গান
আছে তোমার তরে।
-
২৮ জ্যৈষ্ঠ

আবির্ভাব - বহুদিন হল কোন্ ফাল্গুনে ছিনু আমি তব ভরসায়

আবির্ভাব
- ক্ষণিকা
-
বহুদিন হল কোন্ ফাল্গুনে
ছিনু আমি তব ভরসায়;
এলে তুমি ঘন বরষায়।
আজি উত্তাল তুমুল ছন্দে
আজি নবঘন-বিপুল-মন্দ্রে
আমার পরানে যে গান বাজাবে
সে গান তোমার করো সায়
আজি জলভরা বরষায়।

দূরে একদিন দেখেছিনু তব
কনকাঞ্চল-আবরণ,
নবচম্পক-আভরণ।
কাছে এলে যবে হেরি অভিনব
ঘোর ঘননীল গুণ্ঠন তব,
চলচপলার চকিত চমকে
করিছে চরণ বিচরণ।
কোথা চম্পক-আভরণ!

সেদিন দেখেছি খনে খনে তুমি
ছুঁয়ে ছুঁয়ে যেতে বনতল,
নুয়ে নুয়ে যেত ফুলদল।
শুনেছিনু যেন মৃদু রিনি রিনি
ক্ষীণ কটি ঘেরি বাজে কিংকিণী,
পেয়েছিনু যেন ছায়াপথে যেতে
তব নিশ্বাসপরিমল,
ছুঁয়ে যেতে যবে বনতল।

আজি আসিয়াছ ভুবন ভরিয়া
গগনে ছড়ায়ে এলোচুল,
চরণে জড়ায়ে বনফুল।
ঢেকেছে আমারে তোমার ছায়ায়
সঘন সজল বিশাল মায়ায়,
আকুল করেছ শ্যাম সমারোহে
হৃদয়সাগর-উপকূল
চরণে জড়ায়ে বনফুল।

ফাল্গুনে আমি ফুলবনে বসে
গেঁথেছিনু যত ফুলহার
সে নহে তোমার উপহার।
যেথা চলিয়াছ সেথা পিছে পিছে
স্তবগান তব আপনি ধ্বনিছে,
বাজাতে শেখে নি সে গানের সুর
এ ছোটো বীণার ক্ষীণ তার--
এ নহে তোমার উপহার।

কে জানিত সেই ক্ষণিকা মুরতি
দূরে করি দিবে বরষন,
মিলাবে চপল দরশন?
কে জানিত মোরে এত দিবে লাজ?
তোমার যোগ্য করি নাই সাজ,
বাসর-ঘরের দুয়ারে করালে
পূজার অর্ঘ্য-বিরচন--
একি রূপে দিলে দরশন।

ক্ষমা করো তবে ক্ষমা করো মোর
আয়োজনহীন পরমাদ,
ক্ষমা করো যত অপরাধ।
এই ক্ষণিকের পাতার কুটিরে
প্রদীপ-আলোকে এসো ধীরে ধীরে,
এই বেতসের বাঁশিতে পড়ুক
তব নয়নের পরসাদ--
ক্ষমা করো যত অপরাধ।

আস নাই তুমি নবফাল্গুনে
ছিনু যবে তব ভরসায়,
এসো এসো ভরা বরষায়।
এসো গো গগনে আঁচল লুটায়ে,
এসো গো সকল স্বপন ছুটায়ে,
এ পরান ভরি যে গান বাজাবে
সে গান তোমার করো সায়
আজি জলভরা বরষায়।
-
শিলাইদহ, ১০ আষাঢ়, ১৩০৭

চিরায়মানা - যেমন আছ তেমনি এসো

চিরায়মানা
- ক্ষণিকা
-
যেমন আছ তেমনি এসো,
আর কোরো না সাজ।
বেণী নাহয় এলিয়ে রবে,
সিঁথে নাহয় বাঁকা হবে,
নাই বা হল পত্রলেখায়
সকল কারুকাজ।
কাঁচল যদি শিথিল থাকে
নাইকো তাহে লাজ।
যেমন আছ তেমনি এসো,
আর কোরো না সাজ।

এসো দ্রুত চরণ দুটি
তৃণের 'পরে ফেলে।
ভয় কোরো না, অলক্তরাগ
মোছে যদি মুছিয়া যাক--
নূপুর যদি খুলে পড়ে
নাহয় রেখে এলে।
খেদ কোরো না মালা হতে
মুক্তা খ'সে গেলে।
এসো দ্রুত চরণ দুটি
তৃণের 'পরে ফেলে।

হেরো গো, ওই আঁধার হল,
আকাশ ঢাকে মেঘে।
ও পার হতে দলে দলে
বকের শ্রেণী উড়ে চলে,
থেকে থেকে শূন্য মাঠে
বাতাস ওঠে জেগে।
ওই রে গ্রামের গোষ্ঠ-মুখে
ধেনুরা ধায় বেগে।
হেরো গো, ওই আঁধার হল,
আকাশ ঢাকে মেঘে।

প্রদীপখানি নিবে যাবে,
মিথ্যা কেন জ্বাল?
কে দেখতে পায় চোখের কাছে
কাজল আছে কি না আছে?
তরল তব সজল দিঠি
মেঘের চেয়ে কালো।
আঁখির পাতা যেমন আছে
এমনি থাকা ভালো।
কাজল দিতে প্রদীপখানি
মিথ্যা কেন জ্বাল?

এসো হেসে সহজ বেশে
আর কোরো না সাজ।
গাঁথা যদি না হয় মালা
ক্ষতি তাহে নাই গো বালা,
ভূষণ যদি না হয় সারা
ভূষণে নাই কাজ।
মেঘে মগন পূর্ব-গগন
বেলা নাই রে আজ--
এসো হেসে সহজ বেশে,
নাই বা হল সাজ।
-
শিলাইদহ, ২৭ জ্যৈষ্ঠ, ১৩০৭